অর্ধেক ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারই লাইসেন্সহীন

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:৫৮ এএম

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রমরমা ব্যবসা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, সক্ষমতা যাচাই কিংবা কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানগুলো রোগীদের কাছ থেকে নিজেদের মতো করে বিল আদায় করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কোনো সুনির্দিষ্ট মূল্য তালিকাও নেই বলে জানা গেছে।

জানা যায়, বাঁশখালীতে বেসরকারি পর্যায়ে ১৫টি হাসপাতাল ও ৩০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৬-৭টি হাসপাতাল এবং ১২-১৫টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নেই কোনো সরকারি অনুমোদন। অর্থাৎ অর্ধেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সবিহীন। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকে ভুয়া টেকনোলজিস্ট দেখিয়ে প্যাড ছাপিয়ে রিপোর্ট দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। স্থানীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবে গড়া ওঠা এসব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো চিকিৎসাসেবা নিয়ে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বলে জনসাধারণের অভিযোগ। নিজেদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রোগী সংগ্রহ করে দায়সারা রিপোর্ট দিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে তারা।

বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও তাতে ডাক্তার স্বল্পতা, পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো ফায়দা লুটছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

স্থানীয়রা জানান, একই ধরনের টেস্টে বিভিন্ন ল্যাবে ভিন্ন ফলাফল পাওয়া যায়। ডিগ্রিধারী টেকনোলজিস্টের অনুপস্থিতি, কোয়াক বা অনভিজ্ঞ স্টাফ দিয়ে নমুনা সংগ্রহ এসব নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। মানহীন কিট ও নিম্নমানের রি-এজেন্ট ব্যবহার করে রিপোর্ট প্রদান করায় ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি বাড়ছে। এসব অনিয়মের পরেও কোনো তদারকি না থাকায় উপজেলা জুড়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট।

জানা যায়, পুঁইছড়ি প্রেমবাজার থেকে শুরু করে নাপোড়া বাজার, জলদী পৌর এলাকার কেন্দ্রস্থল, চাম্বল বাজার, কালীপুরের গুনাগরি, বৈলছড়ি বাজার, বশির উল্লাহ মিয়াজী বাজার, পুকুরিয়া চাঁদপুর বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় লাইসেন্সহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার অবাধে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কমিশনভিত্তিক দালাল চক্র, যারা রোগীদের বিভিন্ন অজুহাতে জোর করে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট মান নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ায় ভুল ফলাফলের ঝুঁকি বেশি। ফলে চিকিৎসায় ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হচ্ছেন রোগীরা। তারা বলেন, উপজেলা সদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার অনুমোদন ছাড়াই চলছে, যা প্রশাসনের উদাসীনতারই প্রমাণ।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, অবিলম্বে লাইসেন্সবিহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতালগুলো বন্ধ করে যথাযথ অনুমোদন নিয়ে সেবা প্রদানের ব্যবস্থা না করলে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। এ ছাড়া ওষুধ কোম্পানির এমআরদের মন রক্ষা করতে গিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখার অভিযোগ রয়েছে রোগীদের।

এ ব্যাপারে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. নাজমা আক্তার বলেন, ‘বাঁশখালীতে প্রায় ৩৫টির মতো বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাব মালিকদের নিয়ে বসা হয়েছে। তাদের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে যে সব ডকুমেন্ট ও যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, সেসব ঠিক করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এসব তদারকির জন্য ডাক্তারদের সমন্বয়ে একটা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আমরা তদন্ত করে যেসব তথ্য পাচ্ছি, তা সিভিল সার্জনকে রিপোর্ট আকারে পাঠানো হবে।’

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘অধিকাংশ হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স না থাকার বিষয়টি অবগত হয়েছি। এদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত