রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন জন্মগ্রহণ করেছিলেন আজ থেকে একশ পঁয়তাল্লিশ বছর আগে আর মারা গেছেন তিরানব্বই বছর আগে। কিন্তু ক্ষণজন্মা নারী আজও প্রাসঙ্গিক, হাজারো নারীর সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হিসেবে বেঁচে আছেন মানসপটে। তার জীবন ও সংগ্রাম, লেখনী ও দর্শন এত তীব্রভাবে মানুষকে আলোড়িত করে যে, প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর জাতীয়ভাবে রোকেয়া দিবস হিসেবে পালিত হয়। ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মদিন এবং মৃত্যুদিন। তবে তার সংগ্রাম ও দর্শন শুধু জাতীয়ভাবেই স্বীকৃত নয়, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সীমানা ছাড়িয়ে। ২০২৪ সালে তার উপন্যাস ‘সুলতানা’স ড্রিম’ বা ‘সুলতানার স্বপ্ন’কে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ‘বিশ্বস্মৃতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
রোকেয়া রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর। বাবা জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের ও মা রাহাতুন্নেসা তার নাম রাখেন রোকেয়া খাতুন। তাদের পরিবার ছিল অভিজাত মুসলিম পরিবার। পরিবারের ছেলেরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও মেয়েদের জন্য এই সুযোগ ছিল না। তবু রোকেয়া ও তার বড় বোন করিমুন্নেসা ভাইদের পড়া শুনে শুনে এবং ভাইদের কাছ থেকে বাংলা শেখেন। এ বিষয়ে তার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের সহযোগিতা করেছিলেন।
রোকেয়া শুধু বাংলা পড়তেই জানতেন না, তিনি খুব ভালো বাংলা লিখতেও পারতেন। বড় ভাই তার এই লেখালেখিকে উৎসাহ দিতেন। রোকেয়ার স্বামী খান বাহাদুর সাখাওয়াত ছিলেন বড় ভাই ইব্রাহীম সাবেরের বন্ধু। বন্ধুর স্ত্রী-বিয়োগের পর ইব্রাহীম সাবেরই বোনের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেন। এর অন্যতম কারণ ছিল সাখাওয়াত ছিলেন আচরণ ও মননে আধুনিক মানুষ। নারীদের জাগরণ ও শিক্ষার ব্যাপারে তার মনোভাব ছিল ভীষণ ইতিবাচক। তিনি ভেবেছিলেন, রোকেয়ার মতো একজন গুণী ও পড়াশোনায় ইচ্ছুক মেয়ে সাখাওয়াতের স্ত্রী হলে এ ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা ও সহযোগিতা পাবে। তিনি ভুল ছিলেন না। অল্প বয়সে রোকেয়ার বিয়ে হলেও খান বাহাদুর সাখাওয়াতের আধুনিক মনোভাব ও পড়াশোনায় সহযোগিতা পেয়ে রোকেয়া ভীষণ খুশি হন। তারই স্বীকৃতিস্বরূপ সারাজীবন তিনি নিজের নামের সঙ্গে বহন করেছেন স্বামীর নামাংশ। সেই থেকে রোকেয়া খাতুন সব জায়গায় তার নাম লিখতে থাকেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।
রোকেয়া বাংলায় লিখেছেন মতিচুর প্রথম ও দ্বিতীয় খ-, পুস্তকাকারে অপ্রকাশিত ১৬টি প্রবন্ধ, উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’, অবরোধবাসিনী, ছোটগল্প ও রস রচনা ছয়টি এবং কয়েক গুচ্ছ কবিতাবলি। ইংরেজিতে দুটি লেখা আছে, ঝঁষঃধহধ’ং উৎবধস ও এড়ফ এরাবং, গধহ জড়নং।
লেখক আবুল হোসেন মতিচুর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘লেখিকা বঙ্গীয় মোসলেম নারী সমাজের আদর্শ। তিনি অবরুদ্ধা, অবলা ভগিনীগণের দুরবস্থা দেখিয়া তাহাদিগকে জ্ঞান, শিক্ষা, নীতি, কর্ম ও স্বাধীনতায় প্রলুব্ধ করিবার জন্যে পুস্তকখানি লিখিয়াছেন।... পুস্তকে তিনি পুরুষদের বিরুদ্ধে এমন কিছুই বলেন নাই, যাহাতে পুরুষেরা আপত্তি করিতে পারে। ... পুরুষকে কেবল অঙ্গুলি দ্বারা নির্দেশ করিয়া দিয়াছেন মাত্র।’ (বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা কার্তিক ১৩২৮)।
রোকেয়া শুধু নিজে পড়ালেখা শিখে এবং সাহিত্য রচনা করে আত্মতৃপ্তিতে মগ্ন হয়ে থাকেননি। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝতেন সমাজ মেয়েদের পড়াশোনা শেখার পক্ষে কতটা প্রতিকূল। আর এও জানতেন পড়ালেখা শেখা ছাড়া নিজের ভাগ্যকে পরিবর্তনের কোনো উপায় নেই, তা সে ব্যক্তি নারী হন বা পুরুষ।
বিভিন্ন সমাজ সংস্কারকের আন্দোলন ও সচেতনতামূলক পদক্ষেপের কারণে সমাজের পুরুষরা, হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই, পড়াশোনা করত বটে কিন্তু মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য ছিল না কোনো উদ্যোগ। রোকেয়া বুঝতে পেরেছিলেন, অন্য মেয়েরা তার মতো সৌভাগ্যবতী নাও হতে পারে। তারা এমন সহযোগিতাপূর্ণ বড় ভাই ও স্বামী যদি না পায়, তাহলে তো তাদের অজ্ঞানতার অন্ধকারেই থাকতে হবে।
তিনি ঠিক করলেন, মেয়েদের জন্য তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন। এর মধ্যে তার স্বামী সাখাওয়াত হোসেন মারা যান। স্বামীরও সম্মতি ছিল তার স্কুল খোলার বিষয়ে। স্বামীর মৃত্যুর পর তার স্মৃতির সম্মানে তিনি মেয়েদের স্কুলের নাম রাখেন ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’। এই স্কুল যাত্রা শুরু করে মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে। এই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর, ভাগলপুরে। তবে পারিবারিক কারণে কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করলে স্কুলও কলকাতায় স্থানান্তরিত করেন। নানা কারণে রোকেয়াকে এই স্কুলের স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে।
স্কুল পরিচালনা করতে গিয়ে রোকেয়া ব্যাপক সমালোচনার শিকার হন। কিন্তু তিনি তাতে পিছু হটেননি। তিনি ছাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাতেন। অভিভাবকরা যেন তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন সেজন্য তিনি পর্দাঘেরা গাড়ির ব্যবস্থাও করেছিলেন। গাড়িতে একজন নারী পরিচারিকাও থাকতেন। তিনি পর্দাপ্রথার সরাসরি বিরোধিতা না করে পর্দাপ্রথা মেনেই নারীদের শিক্ষার পথ সুগম করতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, শিক্ষার আলো নারীদের হৃদয়ে প্রবেশের পর তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য কোনটি প্রয়োজনীয়, তা বুঝতে পারবে। সেজন্য পর্দাঘেরা গাড়ির ব্যবস্থা করতে দ্বিধা করেননি।
প্রথমদিকে শুধু অবাঙালি ছাত্রীরাই পড়ত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে। রোকেয়ার অনুপ্রেরণায় ক্রমেই বাঙালি মেয়েরাও এগিয়ে আসে পড়াশোনার জন্য। ছাত্রীদের পর্দার ভেতর দিয়েই ঘোড়ার গাড়িতে করে স্কুলে আনা-নেওয়া করা হতো। প্রায় দুই যুগ ধরে বেগম রোকেয়া তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন স্কুল পরিচালনায়।
রোকেয়া শুধু সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ বা সমাজ সংস্কারক নন। তিনি আরও স্পষ্টভাষী ও সুবক্তা। সেজন্য তাকে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হতো। সেখানেও তিনি তার চিন্তা তুলে ধরতেন। তিনি সেখানে সমাজের প্রচলিত চিন্তাধারার সমালোচনা করতে দ্বিধা করতেন না। এমনকি প্রখ্যাত নেতা মহাত্মা গান্ধীকেও সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি। বঙ্গীয় নারীশিক্ষা সমিতির একটি সভায় তাকে সভানেত্রী করা হয়েছিল।
সভানেত্রীর ভাষণে সেদিন তিনি বলেছেন, ‘এখন প্রশ্ন এই যে, মুসলমান বালিকাদের সুশিক্ষার উপায় কী? উপায় তো আল্লাহর কৃপায় অনেকই আছে, কিন্তু অভাগিনীগণ তাহার ফলভোগ করিতে পায় কই? আপনারা হয়তো শুনিয়া আশ্চর্য হইবেন যে, আমি আজ ২২ বৎসর হইতে ভারতের সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি। ভারতবর্ষে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীব কাহারা, জানেন? সে জীব ভারত-নারী! এই জীবগুলির জন্য কখনও কাহারও প্রাণ কাঁদে নাই। মহাত্মা গান্ধী অস্পৃশ্য জাতির দুঃখে বিচলিত হইয়াছেন; স্বয়ং থার্ড ক্লাস গাড়িতে ভ্রমণ করিয়া দরিদ্র রেল-পথিকদের কষ্ট হৃদয়ঙ্গম করিয়াছেন। পশুর জন্য চিন্তা করিবারও লোক আছে, তাই যত্রতত্র “পশুক্লেশ-নিবারণী সমিতি” দেখিতে পাই। পথে কুকুরটা মোটর চাপা পড়িলে, তাহার জন্য এংলো-ইন্ডিয়ান পত্রিকাগুলিতে ক্রন্দনের রোল দেখিতে পাই। কিন্তু আমাদের ন্যায় অবরোধ-বন্দিনী নারীজাতির জন্য কাঁদিবার একটি লোকও এ ভূ-ভারতে নাই।’
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সারাজীবন নারীদের শিক্ষা ও অন্তর্গত মুক্তির জন্য কাজ করেছেন, লেখার মাধ্যমে, বক্তৃতার মাধ্যমে, স্কুল পরিচালনার মাধ্যমে। তিনি সমাজকে সমালোচনা করতে দ্বিধা করতেন না। কারণ কশাঘাত ছাড়া সমাজকে জাগানো যায় না। রোকেয়ার লেখা ও বাণী আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ সমাজ এখনো সর্বাঙ্গীণ অর্থে জাগেনি। যতদিন না জাগবে, রোকেয়া সুলতানাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলবেন।
