যশোরে স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণ, ভিডিও ধারণ ও আত্মহত্যায় বাধ্য করা কেউ আটক হয়নি

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:৪৫ পিএম

যশোরের রামকৃষ্ণপুরে স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণ, ভিডিও করে ছড়িয়ে দেওয়া ও তাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করা চক্রটির কেউ এখনও আটক হয়নি। এ সংক্রান্তে গত বুধবার রাতে নাদিয়ার মা শিল্পী বেগম মামলা করলেও এখন পর্যন্ত একজনও আটক না হওয়ায় ওই পরিবার ও এলাবাবাসীর মধ্যে হতাশা বাড়ছে। দ্রুত ওই চক্রের লোকজনের কঠোর শাস্তির দাবি উঠেছে সর্ব মহল থেকে।

আরও তথ্য মিলেছে, প্রধান অভিযুক্ত নাজমুল চক্র শুধু ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণই নয়, তারা নাদিয়াকে চুল কাটতে ও আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছিল। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত করে একই গ্রামের ৪ জনের বিরুদ্ধে কোতয়ালি থানায় মামলা হয়। আসমিরা হচ্ছে প্রতিবেশী নাছির মোল্লা ও তার ছেলে কথিত প্রেমিক নাজমুল হোসেন, হোসেন ওরফে ট্যাপা হোসেন এবং একই গ্রামের নজরুল মোল্লার ছেলে মিরাজুল ইসলাম।

গত ৮ ডিসেম্বর রাত আটটার দিকে রামকৃষ্ণপুর গ্রামের প্রবাসী মকবুল মোল্লার মেয়ে কিশোরী স্কুল ছাত্রী নাদিয়া আক্তার নদী হাঠাৎ নিখোঁজ হয়। খোঁজাখুঁজি করে নাদিরাকে উদ্ধারে ব্যর্থ হয় স্বজনেরা। ঐ দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে স্বজনেরা জানতে পারেন নাদিরার মরদেহ একই গ্রামের নাজমুলের বসতবাড়ির সামনের একটি আম গাছের ডালে ঝুলে আছে। তথ্য মেলে, মরদেহ উদ্ধারের দুই মাস আগে এলাকার বখাটে চক্রের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেয় এই স্কুল ছাত্রী। যার প্রতিার না হওয়ায় এই মৃত্যু পর্যন্ত পৌঁছানো।

গত ২৬ অক্টোবর একই গ্রামের নাছির মোল্লার ছেলে নাজমুল হোসেনের (২৭) বিরুদ্ধে অভিযোগ করে জীবনাশঙ্কার কথা বলে প্রতিকার দাবি করে। নাদিয়া অভিযোগ করে নাজমুল তাকে বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করাসহ আজেবাজে কথাবার্তা বলতে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন ভাবে হুমকি প্রদর্শনসহ চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। একপর্যায় তার সাথে প্রেমের সম্পর্ক করে বিয়ে প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে।

এছাড়া অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ভিডিও ও ছবি ফোনে সংরক্ষণ করে রাখে। বিয়ের কথ বললে নামজুল কয়েক তাহার সহযোগীর সহায়তায় শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও বিভিন্ন লোকের মোবাইল ফোনে শেয়ার করে দেয়। এই অনৈতিক কাজে নাজমুলের সাথে যোগ দেয় তার সহযোগী একই গ্রামের নজরুল মোল্লার ছেলে মিরাজুল, মৃত আমিন মোল্লার ছেলে ফায়জুর, বাহারুলের নাঈম, নাছির মোলার ছেলে হোসেন ট্যাপা ও রহমানের ছেলে বাবু। এরা সবাই একটি রাজনৈতিক বলয়ে জড়িত।

নাজমুলসহ ওই চক্রটি এলাকার বিভিন্ন লোকের মোবাইল হোয়াটসঅ্যাপেও ছবি পাঠিয়ে নাদিরাকে সমাজে হেয়প্রতিপন্নসহ মানসম্মানের ক্ষতি করছে। একইসাথে ব্লাকমেইল করে ২ লাখ টাকা দাবি করে।

এছাড়া ৭০ হাজার টাকা এরপরও নাজমুল তার ওই ৫ সহযোগী সহায়তায় মারপিট ও খুন জখমের হুমকি দেয়। এই অভিযোগ থানায় দেয়ার পর হুমকি আরও বাড়তে থাকে। থানা পুলিশ ওই অভিযোগের কি তদন্ত করেছিল বা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিয়েছিল তা পরিষ্কার হয়নি। তবে ৮ ডিসেম্বর মধ্য রাতে নাদিয়ার মরদেহ গাছে ঝুলানো অবস্থায় পাওয়া যায় বখাটে ও প্রতারক প্রেমিক নাজমুলে পাড়ির পাশেই। স্থানীয়রা মরদেহ ঝুলতে দেখে ৯৯৯ ফোন দিলে যশোর কোতোয়ালি পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।

এ ঘটনার দুই দিন পর গত ১০ ডিসেম্বর রাতে তার মা শিল্পী বেগম থানায় মামল করেন। তিনি মামলায় উল্লেখ করেন তিনি মেয়েকে নিয়ে স্বামীর বাড়ি থাকতেন। নাদিরা আক্তার ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে লেখাপড়া করত। আসামিরা সকলেই তাদের প্রতিবেশী। স্কুলে যাতায়াতের পথে প্রায় নাদিরাকে উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দিত আসামি নাজমুল। নাদিরা প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় নাজমুল ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র শুরু করে।

এক পর্যায়ে নাদিরা প্রেমে পড়ে যায় নাজমুলের। প্রায় তাদের মধ্যে মোবাইল ফোনে কথা হতো। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নাজমুল তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। সুচতুর নাজমুল সেই দৃশ্য গোপনে তার মোবাইল ফোনেও ধারণ করে রাখে। পরে ভিডিও দেখিয়ে নাজমুল নানাভাবে ব্ল্যাকমেইলিং করতে থাকে। নাদিরা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে নাজমুল তাকে চরিত্রহীন বলে অপবাদ দেয়। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে নাদিরা। এত পর্যায়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয় নদিয়া।

এদিকে স্থানীয়রা জানান, নাজমুলের সাথে নাদিয়ার সম্পর্ক ছিল বেশ কিছুদিনের। তার সরলতার সুযোগ নিয়ে নগ্ন ভিডিও করে এই নাজমুল ভাই মিরাজুল, ফয়জুর রহমান, বাবু ওরফে বাবুল, গাজা কামাল ও নাজমুলের অপর ভাই হোসেন নাদিয়াকে বিভিন্ন সময় হুমকি ধামকি দিত এবং নাজমুল নিজে সেই নগ্ন ভিডিও ফেসবুকে অনলাইনে ছেড়ে দেয়।

দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নাজমুল গং নাদিয়ার জীবন অতিষ্ট করে তোলে। সর্বশেষ উপায় না হয়ে দুই মাস আগে থানায় অভিযোগ করেও প্রতিকার পায়নি নাদিয়া। শেষমেশ মৃত্যুতে সমাপ্তি হয় ঘটনা প্রবাহ। তারা দ্রত ধর্ষক নাজমুল ও পর্ণোগাফিতে জড়িত মামলার পলাতক সব আসামি আটক করে শাস্তি দাবি করেছেন।

যশোর কাতোয়ালি থানার পরিদর্শক তদন্ত কাজী বাবুল হোসেন জানিয়েছেন, নাদিরা মরদেহ উদ্ধার ঘটনা পর পুলিশি জোরালো তদন্ত চলছে। পরিবার থেকে থেকে ধর্ষণ ও পর্ণোগ্রাফি এবং আত্মহত্যার প্ররোচনা ধারায় মামলা দিয়েছে। আসামিদের খোঁজা হচ্ছে। দ্রুত সবাই আটক হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত