চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের এক মন্তব্যের জেরে প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা দেন তারা।
প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়ায় উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসনিক) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন, রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক মো. সাইফুল ইসলাম, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ আটকে পড়েন।
দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে তালা দেওয়ার ৪ ঘণ্টা পরে প্রশাসনিক ভবনের সামনে উপস্থিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। এ সময় ছাত্রদলের নেতা কর্মীদের সঙ্গে চাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাগবিতন্ডা হয়।
এ সময় চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম রনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের একটি বক্তব্যকে ঘিরে প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলে আমাদের চাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি সৃষ্টি করা কোনো ছাত্র সংগঠনের কাজ হতে পারে না। পরে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের পাশে এসে বিক্ষোভ মিছিল করেন শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেতা কর্মীদের মাঝে পাল্টাপাল্টি বাক্য বিনিময় হলে উত্তপ্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন এবং ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের উভয় পাশে এসে জড়ে হয়ে বিক্ষোভ করেন।
চবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হয়। জামায়াতিদের টাকায় নয়। বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খান পাকিস্তানি বাহিনীকে যোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ধরনের বক্তব্যের জন্য উপ-উপাচার্যকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করতে হবে।
এ সময় শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মোহাম্মদ পারভেজ বলেন, ‘ছাত্রদল পুরনো সংস্কৃতিতে ফিরছে। তারা চবি প্রশাসনকে জিম্মি করে চাঁদা দাবি করছে। ছাত্রদলের এরূপ ঘৃণ্য কাজকে আমরা মন থেকে ঘৃণা করি। তারা যদি এই সংস্কৃতি থেকে ফিরে না আসে তাহলে ছাত্রশিবির তাদেরকে কঠোরভাবে প্রতিহত করবে।’ ছাত্রদলের আন্দোলনে যোগদান করেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সংগঠক ধ্রুব বড়ুয়া, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি জশদ জাকির, প্রচার সম্পাদক মুশরেফুল হক রাকিব, সদস্য ও অতীশ দীপংকর হল সংসদের ভিপি রিপুল চাকমা, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদ শাহরিয়ার, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সংগঠক চন্দনা রানী, ছাত্র ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক শেখ জুনায়েদ কবির ও নারী অঙ্গনের সংগঠক সুমাইয়া শিকদার।
এর আগে, গত শনিবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে চবি প্রশাসন আয়োজিত আলোচনা সভায় অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খান একটি মন্তব্য করেন। এই মন্তব্যকে বিতর্কিত উল্লেখ করে তার প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি করেন।
উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আলোচনা সভায় চবি মাননীয় উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের বক্তব্যের কিছু খন্ডিত অংশ কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রচার করায় বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে পরিলক্ষিত হয়। তিনি অ্যাকাডেমিক ডিসকাশনের অংশ হিসেবে তার বক্তব্যে শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকা- আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে বলে মনে করেছেন। এ নিয়ে বিভ্রান্তি কাটানোর জন্য সঠিক তথ্য সবাই জানার জন্য স্বাধীন নিরপেক্ষ একটি তদন্ত কমিশনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তিনি। উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) মনে করেন, ১৯৭২ সালে গুমের শিকার জহির রায়হানকে খুঁজে পেলে সঠিক তথ্য পাওয়া যেত। কারণ জহির রায়হান তৎকালীন ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিশন’ এর চেয়ারপারসন ছিলেন। মানুষ যাতে সঠিক ইতিহাস জানতে না পারেন সেজন্যই জহির রায়হানকে গুম করা হয় বলে মনে করেন চবি উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক)। এ জন্য এর সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার, যাতে জাতির মধ্যে কোনো বিভ্রান্তি না থাকে।’
এদিকে রাত আটটায় প্রতিবেদন লেখার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রশাসনিক ভবনের সামনে ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের সহঅবস্থান দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক আটকে দিয়ে অবস্থান করছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটে জড়ো হয়েছে স্থানীয় যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
জানতে চেয়ে চবি উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করেন নি। জানতে চাইলে চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, ‘আমি একটি মিটিংয়ে আছি তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব হচ্ছে না।’
