সাংবাদিক আনিস আলমগীর পাঁচ দিনের রিমান্ডে

 ডিবি কার্যালয়ে ডেকে মামলা সম্পাদক পরিষদের নিন্দা

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৩০ এএম

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এক আদেশে আনিস আলমগীরের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আনিসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়।

আদালতে রিমান্ড ও জামিন শুনানিকালে আদালতের অনুমতি নিয়ে কিছু কথা বলতে চান আনিস আলমগীর। আদালত অনুমতি দিলে তিনি বলেন, ‘আমি একজন সাংবাদিক। আমি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করি। দীর্ঘদিন ধরে আমি এটি করে এসেছি। আমার কাজ কারও কাছে নতজানু হওয়া না। আমাকে যারা নির্দিষ্ট দলের গোলাম বানাতে চায়, এটা তাদের সমস্যা।’ তিনি বলতে থাকেন, আমার ফেসবুকে আমি সব বক্তব্য দিই। এখানে অপ্রত্যাশিত কিছু নেই। আমি ড. ইউনূসের (প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস) বাড়ি আক্রমণের কথা বলেছি। কিন্তু কোন প্রেক্ষিতে বলেছি, ধানমন্ডি ৩২-এ আক্রমণ, এটা প্রতিহিংসার রাজনীতি। এটা ফিরে আসবে। সেটাই বলেছি। জুলাইয়ের স্পিরিট কীভাবে বাড়বে, সেটা বলেছি। এখানে আমার কী ভুল হয়েছে, আমি জানি না। আমার সঙ্গে কারও যোগসূত্র নেই।’ একপর্যায়ে আনিস আলমগীর বলেন, ‘ড. ইউনূস যদি চান, সারা বাংলাদেশকে কারাগার বানাবেন, বানাতে পারেন।’

এর আগে গত সোমবার রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই মামলায় আরও তিন আসামি হলেন অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, ফ্যাশন মডেল মারিয়া কিসপট্টা ও উপস্থাপক ইমতু রাতিশ ইমতিয়াজ। এই তিনজনের বিষয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল গত রবিবার রাত ৮টার পর সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। এরপর মধ্যরাতে ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামে একটি সংগঠনের সদস্য আরিয়ান আহমেদ বাদী হয়ে আনিস আলমগীরসহ চারজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্টের ষড়যন্ত্র এবং নিষিদ্ধ সংগঠনকে উসকে দেওয়ার অভিযোগে উত্তরা পশ্চিম থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে এ মামলাটি করেন।

মামলায় আনিস আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয় পুলিশ। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মিডিয়ার টকশোতে বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন আসামি আনিস আলমগীর। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যেও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুসারীরা বিভিন্ন কৌশলে দেশে অবস্থান করে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। অভিযুক্তরা এসব কর্মকা-ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত।

অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে অভিযুক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন টেলিভিশন টকশোতে অংশ নিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচারণা চালাচ্ছেন। এর মাধ্যমে তারা আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের অপচেষ্টা করছেন। অভিযুক্তদের এসব বক্তব্য ও অনলাইন কার্যক্রমের কারণে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের কর্মীরা উসকানি পাচ্ছে। ফলে তারা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, সহিংসতা এবং অবকাঠামো ধ্বংসের মতো কর্মকান্ডে জড়িত হচ্ছে।

ডিবি কার্যালয়ে ডেকে মামলা, সম্পাদক পরিষদের তীব্র নিন্দা : ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে সাংবাদিক আনিস আলমগীরের নামে মামলা দেওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে এই নিন্দা জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে আটকে রেখে পরদিন তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয় এবং গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ ধরনের আচরণ অতীতের স্বৈরাচারী শাসনামলে সাংবাদিকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের স্মৃতি উসকে দেয়।

সম্পাদক পরিষদ মনে করে, এ ধরনের চর্চা আমরা অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও প্রত্যক্ষ করেছি। সেই সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, হয়রানি ও নির্বিচার গ্রেপ্তার ছিল নিয়মিত ঘটনা। বর্তমান ঘটনাটি সেই দুঃখজনক বাস্তবতারই পুনরাবৃত্তি।

সম্পাদক পরিষদ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। একই সঙ্গে পরিষদ স্পষ্টভাবে বলতে চায়  কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে তা অবশ্যই প্রচলিত আইন ও ন্যায়বিচারসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। অভিযোগ ছাড়াই ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া, সেখানে আটকে রাখা, কিংবা পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাসিনার পতনের পর থেকে বহু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলা করা হয়েছে। অনেকেই এখনো কারাগারে। এ বিষয়ে আগেও সম্পাদক পরিষদ তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা হত্যা মামলা প্রত্যাহারের কথা। সরকারের পক্ষ থেকে আইন উপদেষ্টাও এসব মিথ্যা মামলা ও হয়রানির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু এখনো মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয়নি। এ ধরনের আচরণ অতীতের স্বৈরাচারী শাসনামলের সাংবাদিক নিপীড়নের স্মৃতিই মনে করিয়ে দেয়। সম্পাদক পরিষদ এ ধরনের আচরণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং সব ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে।

আনিস আলমগীরের গ্রেপ্তারে আসকের উদ্বেগ ও নিন্দা : সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। গতকাল আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির এক বিবৃতিতে বলেন, একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করা হয়েছে, যা স্পষ্টতই আইনটির উদ্দেশ্য ও পরিধির অপপ্রযোগের শামিল। সন্ত্রাসী কর্মকা-ের জন্য প্রণীত একটি কঠোর আইনকে মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার ওপর প্রয়োগ করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। বিবৃতিতে আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে ভিন্নমত ও সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধে এ ধরনের আইনের অপব্যবহার বন্ধের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত