কমে যাচ্ছে খেজুর গাছ আয় হারাচ্ছেন গাছিরা

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৫২ এএম

এক সময় শীত মৌসুমের শুরুতেই গ্রামাঞ্চলে গাছিদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে কোমরে কাছি বেঁধে গাছ থেকে নামাতেন রসের হাঁড়ি। শীতের সকাল মানেই ছিল গরম রোদে বসে কাঁচা খেজুর রস খাওয়ার মেলা।

বাড়ির উঠানে পাতা নতুন চুলায় রস জ্বালিয়ে তৈরি হতো পাটালি গুড়। চুলায় জ্বালানো রসের ক্ষীর নবান্নের উৎসবকে আরও আনন্দমুখর করে তুলত। বাড়িতে বাড়িতে তৈরি হতো পিঠা-পায়েস। গাছের বুক কেটে রস সংগ্রহের কৌশল ছিল এক প্রকার শিল্প। এর ওপর ভর করেই চলত অনেকের জীবিকা। খেজুর গাছ কমে যাওয়া ও অভিজ্ঞ গাছির অভাবে এই পেশা এখন হারাতে বসেছে।

গাছিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাছের বয়স বেশি হওয়া, রেইনট্র্রি, কড়ই ও মেহগনি গাছের কারণে অনেক খেজুর গাছ মারা যাচ্ছে। নতুন করে গাছ লাগানোর প্রতি মানুষের আগ্রহও কম। অপর দিকে রাস্তা প্রশস্তকরণ ও উন্নয়নমূলক কাজের কারণে গ্রামে রাস্তার ধারে থাকা গাছগুলো অবাধে নিধন হচ্ছে। এ কারণে বাজারে খেজুর রস ও গুড়ের চাহিদা থাকলেও তা জোগান দেওয়া এখন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান বাজারে এলাকাভেদে এক লিটার খেজুরের কাঁচা রস বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে দেড়শ টাকায়। এক কেজি ভেজালমুক্ত পাটালি গুড় বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর গ্রামের গাছি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গাছ কাটা আমার বাবার পেশা ছিল। পারিবারিক পেশা হিসেবে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমি এই গাছ কাটছি। আগে রাস্তার ধারে বাড়ির আঙিনায় অনেক খেজুর গাছ ছিল। অল্প সময়েই অনেক গাছে হাঁড়ি পাতা যেত। এখন এক গাছ থেকে আরেক গাছের দুরূত্ব অনেক। গাছ কাটতে সময় লাগে বেশি। রস কম হয়। তাই আয়ও কম। এ ছাড়া একটি গাছের জন্য মালিককে মৌসুমে এক থেকে দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। এ কারণে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।’   

মিজানপুর ইউনিয়নের গঙ্গাপ্রসাদপুর গ্রামের গাছি তাহের শেখ বলেন, ‘আমি প্রায় ২০ বছর খেজুর গাছ কেটে জীবিকা নির্বাহ করেছি। কিন্তু এখন আর আমার এলাকায় খেজুর গাছ পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করতে হয়েছে।’

রাজবাড়ী নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফকীর শাহাদত হোসেন বলেন, ‘খেজুর গাছ ঝোরা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। অনেক ঝুঁকি নিয়ে এই শীতের মধ্যে এই কাজ করতে হয়। এ কারণে এখন আর নতুন করে কেউ এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় আসতে চায় না। অন্যদিকে খেজুরের রস ও গুড় দিয়ে অনেক ধরনের পিঠা তৈরি হয়। বাজারে এর চাহিদা অনেক। উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ায় এই গুড়েও এখন ভেজাল দেওয়া শুরু হয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ বাড়ানো গেলে এই ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা। দিন যাচ্ছে আর এই পেশার ঐতিহ্য হারাচ্ছে। নতুন করে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। একদিকে গাছি সংকটে অনেক গাছ পড়ে থাকে, আবার গাছের বয়সের কারণে রস উৎপাদনও কমে গেছে। এ ছাড়া যারা গাছি রয়েছেন তারা কেউ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়। এমনভাবে গাছগুলো কাটা হয় যে গাছের স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়। অথচ এই খেজুর গাছের রস আহরণ ও গুড় তৈরির মাধ্যমে বড় ধরনের আর্থিক বাজার তৈরি করা সম্ভব। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে খেজুর গাছ লাগানো, গাছের যত্ন নেওয়ার বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। এ ব্যাপারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। যদি কেউ বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে আসত তাহলে খুবই ভালো হতো। এ বিষয়ে কোনো প্রণোদনা দেওয়া যায় কি-না সেটা নিয়েও আমরা ভেবে দেখব। তবে সামাজিকভাবে পরিকল্পিত খেজুর গাছ রোপণের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা যেমন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব, আবার অর্থনৈতিক বাজার তৈরি করাও সম্ভব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত