ইসলামে অরাজকতার স্থান নেই

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৩২ এএম

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিচারহীনতার যে ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ হতে পারে না। তা শুধু অমানবিকই নয়, বরং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার চরম অবমাননাও। আমরা যদি ইসলামের সঠিক বিধানের দিকে তাকাই, তবে দেখব, যেকোনো মানুষকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কোনো সাধারণ নাগরিককে দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ইসলামী শরিয়তের একটি অকাট্য বিধান হলো, কোনো সৃষ্টিকে আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া যাবে না। বুখারি শরিফের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার শুধু আগুনের রব মহান আল্লাহর।’ তিনি ছাড়া আর কেউ এই পদ্ধতিতে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। এটি আল্লাহর একটি একচ্ছত্র অধিকার। মানুষ যখন কাউকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারে, তখন সে মূলত আল্লাহর সমকক্ষ হওয়ার ধৃষ্টতা দেখায়। একইভাবে কোনো মানুষকে পানিতে ডুবিয়ে মারা বা পশুর মতো অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করার ক্ষেত্রেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইসলামে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া আছে, যা শুধু রাষ্ট্র বা আদালত কার্যকর করতে পারে।

যারা এমন বর্বর কাজ করেছে, তারা কি একবারও চিন্তা করে না যে, আমাদের নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে গালি দেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে তিনি কেমন আচরণ করেছিলেন? মক্কার কাফেররা তাকে পাগল বলেছিল, জাদুকর বলেছিল, তার চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছিল এবং সেজদারত অবস্থায় তার ওপর উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তাদের জন্য হেদায়েতের দোয়া করেছেন। এমনকি মক্কা বিজয়ের দিনেও তিনি তার বড় বড় শত্রুদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। যারা আজ আবেগপ্রবণ হয়ে বিচার নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, তারা আসলে রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে।

সমাজে ফেতনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও বড় গুনাহ হিসেবে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। যখন একদল মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয় এবং কাউকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করে, তখন সমাজে চরম অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এ ধরনের কাজ মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উসকে দেয়। তা জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের বর্বরতাকেও হার মানায়। এর ফলে বহিঃবিশ্বে ইসলামের এক নিষ্ঠুর ও সহিংস ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে। যারা ধর্ম রক্ষার নামে এই আগুন জ্বালিয়েছে, তারা মূলত ইসলামেরই ক্ষতি করছে। ইসলাম শান্তি ও সহনশীলতার ধর্ম। এখানে অপরাধের বিচার হবে ইনসাফের ভিত্তিতে, কোনো উন্মত্ত জনতার খেয়ালখুশিতে নয়।

ইসলামি আইন ও শরিয়তের একটি অমোঘ মূলনীতি হলো, অপরাধের বিচার ও দণ্ড কার্যকর করার নিরঙ্কুশ এবং একমাত্র এখতিয়ার হলো রাষ্ট্রের। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা জনতা শরিয়তের নাম দিয়ে কাউকে হত্যা বা শাস্তি দেওয়ার বিন্দুমাত্র অধিকার রাখে না। ইসলামে ‘হুদুদ’ বা আল্লাহ নির্ধারিত দণ্ডগুলো কার্যকর করার ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রপ্রধান বা তার মনোনীত বিচারালয়ের। এমনকি কোনো ব্যক্তি যদি চোখের সামনে কাউকে অপরাধ করতে দেখেও, তবুও সে নিজে কোনো দণ্ড দিতে পারে না, বরং তাকে সাক্ষ্য-প্রমাণসহ রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে হয়।

বিচারহীনভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ফেতনা বা গৃহযুদ্ধের নামান্তর। যখন সাধারণ মানুষ বিচারকের ভূমিকা পালন করে, তখন সেখানে শয়তানের প্ররোচনা থাকে এবং ন্যায়বিচারের কোনো অবকাশ থাকে না। একটি সভ্য সমাজে রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোই হলো শেষ আশ্রয়স্থল। রাষ্ট্র যখন বিচার করে, তখন সেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে এবং উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিচার করা হয়। কিন্তু মব জাস্টিস বা গণপিটুনিতে কোনো প্রমাণ লাগে না, শুধু গুজবের বশবর্তী হয়ে মানুষকে পশুর মতো হত্যা করা হয়। এ ধরনের অরাজকতা সমাজে শান্তি নষ্ট করে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কেড়ে নেয়। যারা এমন কাজ করছে, তারা আসলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং আল্লাহর দেওয়া বিচারিক কাঠামো অস্বীকার করছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, পরকালে প্রতিটি মানুষের রক্তের হিসাব দিতে হবে। কবরের লাশ পুড়িয়ে ফেলা বা একজন জীবিত মানুষকে জনসমক্ষে পুড়িয়ে মারা কোনো ইমানদারের কাজ হতে পারে না। কোনো ব্যক্তি যদি অন্যায় করে থাকে, তবে তাকে যথাযথ আইনি কর্র্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। কিন্তু তা না করে নৃশংসতাকে কোনো অজুহাতেই বৈধ করা সম্ভব নয়। এ ধরনের ঘটনা আমাদের সামাজিক নৈতিকতার পতনকে ফুটিয়ে তোলে। আমরা যদি প্রকৃত মুসলিম হতে চাই, তবে আমাদের ধৈর্য ও সহনশীলতা শিখতে হবে। রাগের বশবর্তী হয়ে বা আবেগের তাড়নায় এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যা সরাসরি আল্লাহর নির্ধারিত সীমাকে লঙ্ঘন করে।

লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত