করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন জামা দিতে ব্যক্তিগত তথ্যের বিষয়ে ভয়ের কিছু নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময় ব্যাংকের তথ্য দিলে ভয়ের কিছু নেই। আমরা কারও ব্যাংক লেনদেন বা ব্যক্তিগত তথ্য দেখি না।’ গতকাল রবিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সদস্যদের জন্য ‘ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল সাপোর্টিং বুথ’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি জানান, আগামী বছর থেকে ভ্যাটের অনলাইন রিটার্নও বাধ্যতামূলক হবে।
জানা গেছে, এ বছর সব করদাতাকে অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে হবে। প্রথমবারের মতো সব করদাতার জন্য এমন অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করায় অনেক করদাতা বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে যারা বয়স্ক করদাতা, তাদের অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার মতো প্রযুক্তিজ্ঞান কম। আবার অনেক করদাতা অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময় ব্যক্তিগত তথ্য বা ব্যাংক হিসাবের তথ্য দিতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বিভিন্ন সংস্থা এসব তথ্য নিয়ে তাদের হয়রানি করতে পারে।
ডিআরইউর সভাপতি আবু সালেহ আকনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল। স্বাগত বক্তব্য দেন অর্থ সম্পাদক নিয়াজ মাহমুদ সোহেল।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময় ব্যাংকের তথ্য দিলে ভয়ের কিছু নেই। আমরা কারও ব্যাংক লেনদেন বা ব্যক্তিগত তথ্য দেখি না। তবে তদন্তের প্রয়োজনে আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। তাই নিয়মতান্ত্রিকভাবে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করলে ভয়ের কোনো কারণ নেই।’
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আগামী বছর থেকে আমরা ভ্যাটের অনলাইন রিটার্নও বাধ্যতামূলক করে দেব। আজও আমি একটা মিটিং করেছিলাম আমাদের বোর্ডে এবং সেখানে আমি নির্দেশনা দিয়েছি যে আমরা পারতপক্ষে পেপার রিটার্নটা নেব না। কারণ এর মধ্যে অনেক ধরনের ঝামেলা হয়।’
কর বা ভ্যাটের রিটার্ন জমা নেওয়ার মাধ্যমে ডলার সাশ্রয় সম্ভব হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভ্যাটের রিটার্নটা খুব সহজ, বেশি জটিল কিছু না। তিনি বলেন, দৌড়াদৌড়ি করে কিংবা যানবাহন ব্যবহার করে ম্যানুয়াল পদ্ধতি রিটার্ন জমা দিতে গেলে তেল পোড়ে। এই তেল কিনতে হয় রেমিট্যান্স থেকে আসা অর্থ দিয়ে।
চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছর এখন পর্যন্ত ২৬ লাখের বেশি করদাতা অনলাইনে তাদের ই-রিটার্ন জমা দিয়েছেন। গত আগস্টে সব করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করে এনবিআর। এক দফা সময় বাড়িয়ে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় এক মাস বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর নির্ধারণ করেছে এনবিআর।
রিটার্ন জমার সময় বাড়বে কি না জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘না সময় বাড়ানোর ব্যাপারটা এখনই বলা যাবে না, আমরা এটা বুঝে নেব। সে ক্ষেত্রে আমাদের যদি প্রয়োজন হয়, পরে হয়তো সরকার বিবেচনা করবে, স্যারদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করব।’
বক্তব্যে ডিআরইউয়ের পক্ষ থেকে ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন দাখিলে সহায়তার জন্য সাপোর্টিং বুথ স্থাপনের উদ্যোগ প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। সম্প্রতি কর বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার দিকনির্দেশনার কথাও উল্লেখ করেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে ট্যাক্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা নেই। সঠিক ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে তথ্য দিলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে কেউ ভুল তথ্য দিলে বা হিসাবের গরমিল হলে দায়ভার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তাবে।’
এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, বর্তমানে সবার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রয়েছে। তবে বয়স্ক করদাতাদের জন্য ম্যানুয়ালি রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থাও চালু আছে। তিনি বলেন, ‘এখনো ভ্যাট কাগজে নেওয়া হচ্ছে, তবে আগামী বছর থেকে ভ্যাটও সম্পূর্ণ অনলাইনে নেওয়া হবে। অনলাইনে কর বা ভ্যাট দাখিলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেন এবং তা পরে ধরা পড়ে, তাহলে তাকে আইনি জটিলতায় পড়তে হবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট আইনজীবী ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদার স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর এসএম সাকিল আহমাদ বলেন, ‘সাংবাদিকরা জাতির বিবেক। আপনারা যদি কর রিটার্ন দাখিলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন, তাহলে সমাজের অন্যরাও আপনাদের দেখে উৎসাহিত হবে।’
ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, সাংবাদিকরা আইন মানতে চায় না; কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা আইন মানি এবং দেশপ্রেমের জায়গা থেকেই কর দিতে চাই। কর দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি আতঙ্ক কাজ করে। এই আতঙ্ক দূর হলে সবাই আরও উৎসাহ নিয়ে কর দিতে আগ্রহী হবে।’
ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, আয়কর রিটার্ন দাখিল একটি জটিল প্রক্রিয়া। এটি এনবিআর এখন অনলাইনে করায় অনেকটাই সহজ হয়েছে। জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে এনবিআরকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আয়কর বিষয়ে গোল্ডেন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও আয়কর উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম, ডিআরইউয়ের কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন এবং আইনজীবী ও সাংবাদিক মিয়া হোসেনসহ ডিআরইউয়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
