র‌্যাবের টিএফআই সেলে গুম: শুনানিতে বাহাস

  • হাসিনা ও সেনা কর্মকর্তাদের বিচার শুরুর আদেশ
  • চিফ প্রসিকিউটরের প্রতি ট্রাইব্যুনালের উষ্মা
আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:০৪ পিএম

আওয়ামী লীগ শাসনামলে র‌্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম করে নির্যাতনের অভিযোগের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কারাগারে থাকা ১০ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল- ১। একইসঙ্গে এ মামলায় প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য ও আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ২১ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল। র‌্যাবের ওই সেলে ১৪ জনকে গুম করে নির্যাতনের ঘটনায় ১৭ আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

মঙ্গলবার এ মামলার শুনানিতে আসামিপক্ষের সময়ের আবেদন নিয়ে ট্রাইব্যুনালে উত্তাপ ছড়ায়। পক্ষে বিপক্ষে বাহাসে জড়ান চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও আসামিপক্ষের আইনজীবী ড. তাবারক হোসেন। একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে  ট্রাইব্যুনাল। আসামিপক্ষের আইনজীবীকেও যথানিয়ম মেনে শুনানি করতে বলেন আদালত। এ মামলায় ১৭ আসামির মধ্যে কারাগারে থাকা ১০ সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালের কাটগড়ায় হাজির করা হয়।

আওয়ামী লীগের সময়ে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় শেখ হাসিনা, ১১ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে গত ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠন করে ১৯ জানুয়ারি গণঅভ্যূত্থান দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদ- দেয় একই ট্রাইব্যুনাল।

টিএফআই সেলে নির্যাতনের মামলায় ১০ সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। অভিযোগ পড়ে শুনিয়ে বেঞ্চের বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী আসামিদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা দোষী না নির্দোষ?’ ১০ সেনা কর্মকর্তা তখন উঠে দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন, ‘আমরা নির্দোষ। ন্যায়বিচার চাই।’ এর মধ্যে কাঠগড়ায় সামনের সারিতে থাকা একজন সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা করি, এই মহান আদালতে আপনাদের (বিচারক) মাধ্যমে আমরা ন্যায়বিচার পাব।’

শুনানিতে উত্তাপ

অভিযোগ গঠনের পর আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী তাবারক হোসেন শুনানির প্রস্তুতিতে তিন মাস সময়ের আবেদন করেন। তিনি এও বলেন, এই অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ (আদেশ পুনর্বিবেচনা) আবেদন করবেন তিনি। এ সময় ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ বলেন, ‘আপনি যদি রিভিউতে ইন্টারেস্ট থাকেন তাহলে করতে পারেন।’ 

তবে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম আসামিপক্ষের এই আরজিতে আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের আইনে অভিযোগ গঠনের পর ২১ দিন সময় পাবেন। তারা আরও সময় চাইছেন। এজন্য কি ট্রায়াল (বিচার) বসে থাকবে?’  

এ সময় বিচারক শফিউল আলম মাহমুদ চিফ প্রসিকিউটরের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনি যেভাবে কথা বলছেন, আমরা তো এখনো অ্যালাউ (রিভিউ আবেদন) করিনি। আমরা কোনো আদেশ দিলে বা কথা বললে আপনি অপিনিয়ন (মতামত) দিতে পারেন। কিন্তু এভাবে কথা বলতে পারেন না।’ 

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমি কি বললাম?’  

বিচারক বলেন, ‘ডিফেন্স (আসামিপক্ষের আইনজীবী) কথা বললেই আপনি দাঁড়িয়ে যান। আমরা তো আমাদের মতামত দিতে পারি। আমরা তো এখনো ফাইনাল অর্ডার দিইনি।’    

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা কোনো প্রেজুডিস (অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত) চাই না। যারা এসব ঘটনার (গুম) ভুক্তভোগী তাদের তো বিচার পাওয়ার অধিকার আছে।’ 

বিচারক বলেন, ‘এখানে কোনো প্রেজুডিস হচ্ছে না। আপনি এমন কিছু বলবেন না যাতে আদালতের ওপর প্রেশারাইজড (চাপ প্রয়োগ) হয়।’

এ সময় প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম বিচারকদের উদ্দেশ্যে বলেন,  ‘মাঝে মধ্যে এই বিষয়গুলো (বিচারকদের মতামত) আদেশের মত মনে হয়। এজন্যই আমরা আইনের মধ্য থেকে বিরোধিতা করি। আমাদেরকে তো আমাদের কাজ করতে দিতে হবে।’  

এ সময় আইনজীবী তাবারক হোসেন রিভিউ আবেদনের জন্য ১৫ দিনের সময়ের আরজি জানান। জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, ‘এটা তো ১৫ মিনিটের কাজ। আপনি পুরো মামলার নথি পড়বেন না কি রিলেটেড অংশগুলো পড়বেন। এভাবে হলে তো মাসের পর মাস সময় লাগবে।’

এ সময় চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘তারা (আসামিপক্ষ) ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমকে যেভাবেই হোক বিলম্ব করতে চাইছে। এটার উদ্দেশ্য কি বোঝা যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের হত্যা করা হচ্ছে। চাকু মারা হচ্ছে। সাক্ষীরা একটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।’

চিফ প্রসিকিউটর এ সময় আরও বলেন, ‘তারা (আসামিপক্ষের আইনজীবী) বাইরে গিয়ে বলেন, ‘এখানে (ট্রাইব্যুনালে) আর্মির (সেনাবাহিনী) বিচার হচ্ছে। অথচ যাদের বিচার হচ্ছে ঘটনার সময় তারা কোনো আর্মির পোষাকে ছিলেন না। র‌্যাবের দায়িত্বে ছিলেন। এভাবে আর্মিকে ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি করা হচ্ছে।’  

এ সময় ট্রাইব্যুনালের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, ‘এখানে কোনো সেনাবাহিনীর বিচার হচ্ছে না।’  

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘বিচার ডিলে (বিলম্ব) করার জন্য আসামিপক্ষ এসব করছে।’  
 
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা বিচার ডিলে করব না।’  

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে সাক্ষীদের মেরে ফেললে আমরা বিচার করব কিভাবে?’  

একপর্যায়ে আইনজীবী তাবারক হোসেন উঠে দাঁড়িয়ে চিফ প্রসিকিউটরের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, ‘এখানে আর্মিদের বিচার হচ্ছে এমন কোনো কথা আমি বলিনি। আমি বলেছি সেনা কর্মকর্তাদের বিচার হচ্ছে।’  

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমার কাছে রেকর্ড আছে।’  

তারাবক হোসেন বলেন, ‘উনি (চিফ প্রসিকিউটর) বিচার নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন?’  

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা কোনো তাড়াহুড়ো করছি না।’ 

এ সময় তাবারক হোসেনের উদ্দেশ্যে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আপনি দাঁড়ালেন কেন? বসেন।’ এসময় বিচারকও আইনজীবীকে বসতে বলেন। এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল শুনানি করতে চার সপ্তাহের সময় মঞ্জুর করেন। 

তারিখ ধার্যের পর তাবারক হোসেন আবারও উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘চিফ প্রসিকিউটর আমাকে বসতে বলতে পারেন না। আমি উনার সিনিয়র। ট্রাইব্যুনাল আমাকে বসতে বলতে পারেন। আপনি (চিফ প্রসিকিউটর) পারেন না। আমি কথা বললে উনি পিছন থেকে ডিক্টেট করেন। এটা উনি করতে পারেন না।’
   
প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘উনি (চিফ প্রসিকিউটর) কিছু রিপ্লাই দিয়েছেন।’ 

তারিখ ধার্যের পর বেঞ্চের সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ উভয়পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে হাস্যচ্ছোলে বলেন, ‘আপনারা কি আমাদের হ্যাপি নিউ ইয়ারও পালন করতে দিবেন না?’ এ সময় চিফ প্রসিকিউটর হাস্যচ্ছোলে বলেন, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ারের জায়গায় হ্যাপি জানাজা হয়ে যায় কি না বলা তো যায় না।’    

টিএফআই সেলে গুমের মামলায় কারাগারে থাকা ১০ জন সেনা কর্মকর্তা হলেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো. কামরুল হাসান, মো. মাহাবুব আলম ও কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্ততিমূলক ছুটিতে), লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম সুমন ও মো. সারওয়ার বিন কাশেম। এছাড়া শেখ হাসিনা, তার সাবেক সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজির আহমেদ, র‌্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশীদ হোসেন, হারুন অর রশীদ ও র‌্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মো. খায়রুল ইসলামসহ সাতজন এখনো পলাতক। 

জিয়াউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন নিয়ে শুনানি ৪ জানুয়ারি

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল জিয়াউলকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। প্রসিকিউশনপক্ষে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী এ মামলায় জিয়াউলকে গ্রেপ্তার দেখানোর (প্রডাকশন ওয়ারেন্ট) আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করে ৪ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির জন্য রাখেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত