মিথ্যা খবর ও ছবির ভিড়ে সত্য খুঁজবেন

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:২৮ এএম

আমরা এমন এক সময় পার করছি, যেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা বেশ কঠিন। ফ্যাক্ট-চেকিং বা সত্য যাচাই করতে দীর্ঘ সময় লাগলেও এআই ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য তৈরি করতে লাগছে মাত্র কয়েক মিনিট। আমরা বিভ্রান্ত হচ্ছি নিয়মিত। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কিছু নির্দিষ্ট কৌশল এবং সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে কীভাবে এআই কন্টেন্ট শনাক্ত করবেন জেনে নিন।

অতিরিক্ত নিখুঁত হওয়াই সন্দেহের কারণ : বাস্তব জীবনের ছবি সবসময় নিখুঁত হয় না। কিন্তু এআই ছবিকে প্রায়ই অতিরিক্ত সুন্দর বা ‘টু গুড টু বি ট্রু’ মনে হয়। ছবির মানুষটির ত্বক কি একদম মসৃণ? কোনো দাগ বা লোমকূপ নেই? চুলে কি কৃত্রিম জেল্লা দেখা যাচ্ছে? যুদ্ধের ময়দান বা দুর্যোগের ছবিতে কারও পোশাক কি পরিপাটি? গয়না বা চশমার ডিজাইন কি চ্যাপ্টা গ্রাফিক্সের মতো মনে হচ্ছে? এসব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হোন।

শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও অসামঞ্জস্য : এআই মানুষের শরীর নিখুঁত করতে গিয়ে প্রায়ই ভুল করে। এআই-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো হাত। অনেক সময় হাতের আঙুল পাঁচটির বদলে ছয়টি দেখা যায়। আবার আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা বা বাঁকা হতে পারে। তাছাড়া চোখের মণির দিকে তাকান। আসল ছবিতে চোখের মণিতে আলোর প্রতিফলন থাকে। এআই ছবিতে দুই চোখের মণি দুই রকম হতে পারে। দাঁতগুলো অতিরিক্ত সাদা বা সমান মনে হতে পারে।

আলো-ছায়া ও পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম : এআই ছবি বানাতে পারে ঠিকই। তবে আলো-ছায়ার বিজ্ঞান বোঝে না। ছবির আলোর উৎস কোন দিকে? সূর্যের আলো যেদিক থেকে আসছে, ছায়া তার বিপরীত দিকে পড়ার কথা। এআই ছবিতে অনেক সময় এলোমেলো ছায়া দেখা যায়। পানিতে বা আয়নায় প্রতিবিম্ব ঠিকঠাক পড়ছে কি না খেয়াল করুন। ছবির পেছনের দৃশ্য বা ব্যাকগ্রাউন্ড ঝাপসা বা বিকৃত হতে পারে।

লেখার দিকে নজর দিন : ছবির ভেতরে কোনো সাইনবোর্ড, টি-শার্টের লেখা বা দোকানের নাম থাকলে তা পড়ার চেষ্টা করুন। এআই টেক্সট বা লেখা জেনারেট করতে এখনো দুর্বল। অধিকাংশ সময় লেখাগুলো অস্পষ্ট, অর্থহীন বা অক্ষরের কোনো আগামাথা থাকে না।

উৎস খোঁজা ও রিভার্স ইমেজ সার্চ : কোনো ছবি সন্দেহজনক মনে হলে প্রথমেই তার উৎস খুঁজুন। গুগলে ‘রিভার্স ইমেজ সার্চ’ করে দেখুন ছবিটি আগে কোথাও ব্যবহৃত হয়েছে কি না। অনেক সময় প্রথম আপলোডকারী ব্যক্তিই ছবির ক্যাপশনে বলে দেন যে এটি এআই দিয়ে তৈরি। বিখ্যাত ব্যক্তিদের ভুয়া ছবির ক্ষেত্রে তাদের আসল ছবি খুঁজুন।

প্রযুক্তিগত ও দৃশ্যমান সূত্র : ছবিতে কিছু প্রযুক্তিগত চিহ্ন বা ওয়াটারমার্ক থাকতে পারে। ডাল-ই বা ক্রেয়ন-এর মতো টুলগুলো ছবির কোনায় বিশেষ রঙের বার বা পেন্সিলের চিহ্ন রাখে। তবে এগুলো অনেক সময় কেটে বাদ দেওয়া হয়। ছবির ফাইলের প্রপার্টিজ বা মেটাডেটা চেক করুন। সেখানে এডিটিং সফটওয়্যারের নাম থাকতে পারে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোডের পর এই তথ্য মুছে যায়। সন্দেহ হলে ‘TrueMedia.orgÕ ev ÔHiya Deepfake Voice Detector’-এর মতো টুল ব্যবহার করে যাচাই করে নিন।

অডিও ও ভিডিওর কারসাজি : ডিপফেক ভিডিও এবং ভয়েস ক্লোনিং এখন বড় উদ্বেগের কারণ। এআই দিয়ে তৈরি কণ্ঠ রোবটের মতো একঘেয়ে শোনায়। কথার মাঝে মানুষের মতো স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়ার শব্দ থাকে না। ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনো শব্দ থাকে না। একদম নিস্তব্ধ মনে হয়। ভিডিওতে মানুষের চোখের পলক ফেলার গতি অস্বাভাবিক হতে পারে। ঠোঁটের নড়াচড়ার সঙ্গে কথার অমিল থাকার সম্ভাবনা থাকে।

সাধারণ বুদ্ধি ও প্রেক্ষাপট : সবশেষে নিজের যুক্তি ও সাধারণ জ্ঞান কাজে লাগান। ছবির ঘটনার সঙ্গে ঋতুর মিল আছে তো? গ্রীষ্মকালের ঘটনায় শীতের পোশাক পরা বা পুরনো আমলের ছবিতে আধুনিক স্মার্টফোন দেখা যাওয়া এগুলো বড় প্রমাণ। বাংলাদেশের রাস্তায় এমন ট্রাফিক সাইন দেখা যাচ্ছে যা বাংলাদেশে নেই এমন ছোটখাটো ভুলগুলো খেয়াল করুন। কোনো ছবি বা ভিডিও দেখে যদি মনে হয় ‘কিছু একটা ঠিক নেই’ বা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে নিজের সেই অনুভূতিকে বিশ্বাস করুন। প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছে, তাই এআই শনাক্তকরণও কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে ওপরের বিষয়গুলো মাথায় রাখলে এবং একটু সতর্ক থাকলে মিথ্যা তথ্যের ফাঁদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত