ব্লুটুথ সবসময় অন রাখলে

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:২৯ এএম

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে কিছু অদৃশ্য বিপদ। ব্লুটুথ একটি তারবিহীন সংযোগ ব্যবস্থা। এটি আমাদের স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ইয়ারফোন, স্মার্টওয়াচ সব কিছুতেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সবসময় ব্লুটুথ চালু রাখা মানে ‘ঘরের দরজা খোলা’ রেখে ঘুমিয়ে যাওয়ার মতো। এর ফলে যে কোনো মুহূর্তে ডিভাইস হ্যাকিংয়ের শিকার হতে পারে।

অদৃশ্য বিপদের নাম ব্লুটুথ হ্যাকিং

ব্লুটুথ কাছাকাছি থাকা দুটি ডিভাইসের মধ্যে অল্প দূরত্বে তথ্য আদান-প্রদান করে। এটি সাধারণত ১০ মিটার পর্যন্ত সংকেত পাঠাতে পারে। যখন ডিভাইস ‘ডিসকাভারেবল’ অবস্থায় থাকে, তখন অপরিচিত কেউও সেটি শনাক্ত করতে পারে। সেখান থেকেই শুরু হতে পারে নিরাপত্তার ঝুঁকি। ব্লুটুথের মাধ্যমে তিন ধরনের সাইবার আক্রমণ হতে পারে

          ব্লুস্নার্ফিং: এর মাধ্যমে হ্যাকার অনুমতি ছাড়াই ফোনে ঢুকে কন্টাক্ট নম্বর, ছবি, মেসেজ বা পাসওয়ার্ড চুরি করতে পারে।

          ব্লুজ্যাকিং: অপরিচিত কোনো মেসেজই ব্লুজ্যাকিং। এর মাধ্যমে বিজ্ঞাপন বা ক্ষতিকর লিংক পাঠানো হয়।

          ব্লুবাগিং: এর মাধ্যমে ফোনের মাইক্রোফোন বা ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করে কথোপকথন শুনতে বা ভিডিও দেখতে পারে।

শুধু ফোন নয়, ঝুঁকি অন্যান্য যন্ত্রেও

ব্লুটুথ এখন স্মার্টঘড়ি, গাড়ির সাউন্ড সিস্টেম, ফিটনেস ব্যান্ড, এমনকি চিকিৎসা যন্ত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) ২০২২ সালে জানিয়েছিল, ব্লুটুথ সংযোগের কারণে কিছু চিকিৎসা যন্ত্রে নিরাপত্তা দুর্বলতা থাকতে পারে। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এই সংযোগে হস্তক্ষেপ করলে পেসমেকার বা ইনফিউশন পাম্পের কার্যক্রমেও সমস্যা হতে পারে। এমন ঘটনা বিরল। তবুও এটিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

গোপন নজরদারির নতুন পথ

ব্লুটুথ হ্যাকিংয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্যও হুমকি। বড় শপিং মলগুলো ব্লুটুথ বিকন ব্যবহার করে ক্রেতাদের অবস্থান, চলাচল এবং কেনাকাটার ধরন বিশ্লেষণ করে। এই তথ্য থেকে তারা ক্রেতার অভ্যাস, পছন্দ এমনকি ভবিষ্যৎ কেনাকাটার সিদ্ধান্তও অনুমান করতে পারে। যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন।

ঝুঁকি কমানোর সহজ উপায়

ব্লুটুথ পুরোপুরি বন্ধ না রাখলেও সঠিক ব্যবহারবিধি মেনে চললে ঝুঁকি কমানো যায়। কয়েকটি কার্যকর পরামর্শ হলো:

          ভিড় বা উন্মুক্ত জায়গায় ব্লুটুথ চালু রাখলে হ্যাকারদের সুযোগ তৈরি হয়। তাই অচেনা স্থানে ব্লুটুথ বন্ধ রাখুন।

          স্বয়ংক্রিয় সংযোগ বন্ধ করুন। এতে আপনার ডিভাইস অজানা সংযোগের সঙ্গে নিজে নিজেই যুক্ত হবে না।

 যদি কোনো অননুমোদিত সংযোগের চেষ্টা হয়, তবে সঙ্গে        সঙ্গেই ‘না’ বা ‘বাতিল’ করুন।

 পুরনো সফটওয়্যারে নিরাপত্তা দুর্বলতা থাকতে পারে। তাই নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট রাখলে ঝুঁকি কমে যায়।

          কোন অ্যাপ আপনার ব্লুটুথ বা অবস্থান-তথ্য ব্যবহার করছে, তা নিয়মিত যাচাই করুন।

          ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করুন। এটি ইন্টারনেট সংযোগকে নিরাপদ ও তথ্য গোপন রাখে।

গবেষণার তথ্য কী বলছে?

ক্যাসপারস্কির ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী প্রতিবছর অন্তত একবার ব্লুটুথ হ্যাকিংয়ের আক্রমণের শিকার হন বা ঝুঁকিতে পড়েন। অন্য এক গবেষণায় দেখা যায়, ৫০০ কোটিরও বেশি ডিভাইস ‘ব্লুবোর্ন’ নামক দুর্বলতার কারণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। বাংলাদেশে পরিচালিত একটি ছোট জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ মোবাইল ব্যবহারকারী সারাক্ষণ ব্লুটুথ চালু রাখেন। তাদের মধ্যে অর্ধেকেরও কম এই ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন। ব্লুটুথ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ। এই তারবিহীন সংযোগ আমাদের কাজ সহজ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির প্রতিটি সুবিধার সঙ্গেই কিছু ঝুঁকি থাকে। ব্লুটুথও এর ব্যতিক্রম নয়। সচেতন ব্যবহারই এখানে মূল নিরাপত্তা। প্রয়োজন শেষে ব্লুটুথ বন্ধ রাখুন। ডিভাইসের সফটওয়্যার আপডেট রাখুন। অচেনা-অজানা সংযোগের বিষয়ে সতর্ক থাকুন। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, ব্যবহারকারীর অসচেতনতাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত