দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পররাষ্ট্রনীতিতে আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মধ্যরাতে পরিচালিত এক নাটকীয় অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করার ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের হুঁশিয়ারিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
এই অভিযানের ব্যাখ্যায় ট্রাম্প ১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিনের প্রসঙ্গ টেনে এনে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের কথা বলেন। তিনি একে নতুন নামে আখ্যা দেন ‘ডনরো ডকট্রিন’। ভেনেজুয়েলার ঘটনার পরপরই ওয়াশিংটন যেসব দেশ ও অঞ্চলের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো—
গ্রিনল্যান্ড
আর্কটিক অঞ্চলের বিশাল দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সেখানে পিটুফিক স্পেস বেস নামে একটি মার্কিন ঘাঁটি থাকলেও ট্রাম্প পুরো দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে সেখানে রুশ ও চীনা নৌযান চলাচল বাড়ছে। ডেনমার্কের অন্তর্ভুক্ত এই দ্বীপটি বিরল খনিজে সমৃদ্ধ, যা আধুনিক প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে অপরিহার্য। এ ছাড়া বরফ গলে নতুন নৌপথ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনাও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডরিক নিলসেন যুক্তরাষ্ট্রে যুক্ত হওয়ার ধারণাকে ‘অবাস্তব’ বলে মন্তব্য করেছেন। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেনও স্পষ্ট করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না এবং সামরিক চাপ গ্রহণযোগ্য নয়।
কলম্বিয়া
ভেনেজুয়েলায় অভিযানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর প্রতি কড়া সতর্কবার্তা দেন ট্রাম্প। তেল ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ কলম্বিয়া দীর্ঘদিন ধরে কোকেন উৎপাদন ও পাচারের জন্য আলোচিত।
ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, দেশটির সরকার মাদক কার্টেল দমনে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি এমনকি কলম্বিয়াকে লক্ষ্য করে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দেননি। যদিও ঐতিহাসিকভাবে মাদকবিরোধী অভিযানে কলম্বিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অংশীদার এবং প্রতিবছর বিপুল সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে।
ইরান
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরেও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিক্ষোভ দমনে আরও প্রাণহানি হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠিন প্রতিক্রিয়া জানাবে।
গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইসরায়েলের অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকেও ইরান ইস্যু প্রাধান্য পেয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্যে, ভবিষ্যতে নতুন হামলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
মেক্সিকো
ট্রাম্পের রাজনীতিতে মেক্সিকো বরাবরই স্পর্শকাতর ইস্যু। ক্ষমতায় ফিরেই তিনি মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তনের নির্বাহী আদেশে সই করেন। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অবৈধ অভিবাসী প্রবেশ ঠেকাতে মেক্সিকো যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছে না—এমন অভিযোগও করেন।
তার দাবি, মেক্সিকোর কার্টেলগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এ বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাম স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।
কিউবা
ফ্লোরিডা উপকূল থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে অবস্থিত কিউবা দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র এই দেশটি বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটে আছে।
ট্রাম্পের মতে, কিউবা নিজেই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, তাই সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নাও হতে পারে। ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর কিউবার বড় অংশে নির্ভরশীলতা থাকায় মাদুরো সরকারের পতন হলে হাভানার পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও কিউবার শাসনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ট্রাম্পের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
