বেনাপোল কাস্টমসে রাজস্ব আদায়ে ধস, ৬ মাসে ঘাটতি হাজার কোটি

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম

বেনাপোল কাস্টম হাউসে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৩ কোটি টাকার বেশি, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় ধস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। বিপরীতে এ সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ১২০ দশমিক ৫ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৩ কোটি টাকা।

কাস্টমস সূত্র জানায়, সরকার পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের শীতলতা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে। আগে যেখানে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করত, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ ট্রাকে। ট্রাক চলাচল কমে যাওয়ায় আমদানির পরিমাণ ও রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

বাণিজ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি বাণিজ্যের স্থবিরতা, ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপড়েন এবং বন্দরের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম মিলিয়ে এই সংকট আরও গভীর হয়েছে। বেনাপোল কাস্টমসে ছয় মাসে এ ধরনের বড় রাজস্ব ঘাটতি গত এক দশকে বিরল।

মাসভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের চিত্রেও পতনের ধারা স্পষ্ট। জুলাই মাসে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করলেও আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে ঘাটতি বাড়তে থাকে। আগস্ট মাসে ৪৯৩ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ৪৪৭ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে ৬০১ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয় ৫১৩ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা। অক্টোবরে ৬৪৫ কোটির বিপরীতে আদায় হয় ৪৪৯ দশমিক ২৮ কোটি টাকা। নভেম্বরে ৭৫৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ৫৬৪ দশমিক ৪১ কোটি টাকা। ডিসেম্বর মাসে এক হাজার ১৩১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৬০০ দশমিক ৮১ কোটি টাকা, যা সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বেনাপোল বন্দর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ১৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন পণ্য। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়সহ পুরো ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৬৩ হাজার ৪২০ মেট্রিক টনের বেশি। এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বাণিজ্যে এই বড় পতন বেনাপোল বন্দরের ইতিহাসে অন্যতম নজিরবিহীন ঘটনা।

বিশেষ করে উচ্চ শুল্কযোগ্য পণ্যের আমদানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। শিল্প কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, যন্ত্রাংশ ও কেমিক্যাল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় শুল্ক ও ভ্যাট আদায়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে।

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই দায়ী নয়। কাস্টম হাউস ও বন্দরের অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও অনিয়মও আমদানিকারকদের বেনাপোলমুখী আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।

বেনাপোল বন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহ-সভাপতি আমনুল হক বলেন, ‘আগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ ট্রাক পণ্য আমদানি হতো। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাকে। একইভাবে রপ্তানিও ৩০০ ট্রাক থেকে নেমে এসেছে প্রায় ১৫০ ট্রাকে। ফলে আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ও কমেছে।’

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার অটল বিহারী বলেন, ‘আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য কমে যাওয়ার ফলে প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। তবে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা, দ্রুত পণ্য খালাস এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জোরদারে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, অর্থবছরের শেষ দিকে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত