বহিষ্কারেও থামছেন না বিএনপির বিদ্রোহীরা

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩১ এএম

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন-সমঝোতা হলেও মাঠে বিএনপি ও তার শরিকদের মধ্যে টানাপড়েন বাড়ছেই। শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে বিএনপির একাধিক নেতা বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে থাকায় জোটের ঐক্য ও সমন্বয়ের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দলীয় সতর্কবার্তা ও বহিষ্কারাদেশ সত্ত্বেও বিদ্রোহী প্রার্থীরা সরে না দাঁড়ানোয় পরিস্থিতি জটিল আরও হয়েছে।

জোটের অন্তত এক ডজন শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে আসন-সমঝোতা অকার্যকরতার মধ্যে পড়েছে। শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের সহযোগিতা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় তা ঘটছে না। এতে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়ছে, তৃণমূলে সাংগঠনিক কার্যক্রম দুর্বল হচ্ছে এবং জোট প্রার্থীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।

নির্বাচনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে বিএনপি ১৬টি আসনে সমঝোতা করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ, নড়াইল-২ আসনে এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, যশোর-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি রশিদ বিন ওয়াক্কাছ, পটুয়াখালী-৩ আসনে গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, ঝিনাইদহ-৪ আসনে রাশেদ খান, ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, ঢাকা-১৩ আসনে এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বিএলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে সৈয়দ এহসানুল হুদা এবং কুমিল্লা-৭ আসনে এলডিপির রেদওয়ান আহমেদ।

তাদের মধ্যে ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, রাশেদ খান, শাহাদাত হোসেন সেলিম, সৈয়দ এহসানুল হুদা, রেদওয়ান আহমেদ ও ববি হাজ্জাজ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ চারটি আসনে খেজুর গাছ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ধানের শীষ প্রতীকে যেসব প্রার্থী নির্বাচন করছেন তারা হলেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনে শাহাদাত হোসেন সেলিম ও ঢাকা-১৩ আসনে ববি হাজ্জাজ। এ দুটি আসনে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী না থাকায় তারা তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে আছেন।

জোট শরিকদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। বিএনপি যেসব আসন ছেড়ে দিয়েছে সেসব আসনে দলটির স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীদের সক্রিয়তা জোট প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে শরিক দলের নেতারা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি হস্তক্ষেপ চাইছেন। তাদের দাবি, তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হলে কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর ও প্রকাশ্য নির্দেশনা দেওয়া জরুরি।

শরিক দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আসন ছাড়ের বিষয়ে তৃণমূলে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে জানানো হলেও কাক্সিক্ষতমাত্রায় উন্নতি হয়নি। অনেক জোট প্রার্থী আশঙ্কা করছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর নির্দেশনা না এলে পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হবে।

জোট নেতাদের আশঙ্কা, তৃণমূল পর্যায়ের এ বিদ্রোহ জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুন্ন করতে পারে এবং একাধিক আসনের ফলাফল প্রভাবিতও হতে পারে। এ কারণে তারা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

বিএনপিসূত্র জানিয়েছে, দলের আগামী স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। অতিসম্প্রতি রাজধানীর গুলশান কার্যালয়ে বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনের প্রার্থীরা। তারা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে তারেক রহমানকে অবহিত করেন। তারা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, ঢাকা-১২ আসনের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক ও বগুড়া-২ আসনের নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। বিএনপির চেয়ারম্যান বিদ্রোহী প্রার্থীদের ডেকে আলোচনা করে সমাধান করার আশ্বাস দিয়েছেন। এরপর শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী তার মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বহিষ্কৃত হওয়ার পরও এক বিএনপি নেতা আমার আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান বিষয়টি দেখবেন।’

সারা দেশের ১১৭টি আসনে বিএনপির ১১৯ জন নেতা নিজ দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। বাছাই পর্বে কয়েকজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও অধিকাংশই টিকে গেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোথাও পুরনো নেতার বাদপড়াজনিত ক্ষোভ, কোথাও স্থানীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার বড় কারণ।

বিএনপিসূত্র জানায়, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে। এরপরও কেউ নির্বাচনে থাকলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, দলের বিদ্রোহী নেতাদের গুলশানের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে কথা বলছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। ঝিনাইদহের শরিককে ছেড়ে দেওয়া আসনের বিদ্রোহী এক প্রার্থীকে গুলশানের কার্যালয়ে ডেকে আনা হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাকে তিনি বলেছেন, ‘আমি নির্বাচন করব। প্রয়োজনে আমাকে বহিষ্কার করে দেন। কাগজ নিয়ে আসুন আমি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে দিচ্ছি।’ এমন অন্তত অর্ধশত নেতাকে ডেকে আনা হলেও তাদের মাত্র কয়েকজন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে গুলশান কার্যালয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামান। সাক্ষাতের পর ভিডিও বার্তায় তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানান। তিনি প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ছিলেন। ঝিনাইদহ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মুর্শিদা খাতুন (মুর্শিদা জামান পপি) মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। তিনি জেলা বিএনপির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুজ্জামান বেল্টুর স্ত্রী।

গত বুধবার সন্ধ্যায় তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি এমএ খালেক স্বতন্ত্র প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। তাকে গত ৩০ ডিসেম্বর বহিষ্কার করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন দলের সাবেক এমপি আতাউর রহমান খান আঙ্গুর। শুক্রবার তাকেও গুলশানের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান কথা বলেছেন। তিনি এখনো প্রত্যাহারের ঘোষণা দেননি।

মাদারীপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুবদলের নির্বাহী কমিটির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান পলাশও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য রেখে আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ সুনামগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান চৌধুরীও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য এবং ছাতক উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান।

বিদ্রোহীদের কেউ কেউ বলছেন, বিএনপির পক্ষ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ডেকে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও এরই মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ৯ নেতাকে বহিষ্কার করেছে। এ বহিষ্কার নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ বহিষ্কার করায় বিষয়টি ভালোভাবে নেননি অনেক নেতাকর্মী। তারা বলছেন, বহিষ্কারের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ বন্ধ করা হয়েছে। এটি বিদ্রোহীদের নির্বাচনে লড়ার পরোক্ষ ‘গ্রিন সিগন্যাল’।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। অনেকেই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।’

আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আসন সমঝোতার কারণে অনেক যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন পাননি। ফলে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।’

নির্বাচনসংশ্লিষ্টদের মত হচ্ছে, দলের ভেতরের বিদ্রোহ দমনে বিএনপির সক্ষমতা এখন বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরীক্ষার ফলাফলের দিকে উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছে জোট শরিকরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত