রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে জাবি আলোনসোর বরখাস্তের সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন বিস্ময়কর, অন্যদিকে তেমনই খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয়। বার্নাব্যুতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের শাসনামলে এমন নাটকীয় সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়। তবে গত মে মাসে ‘নতুন যুগের’ সূচনা করার দায়িত্ব দিয়ে আলোনসোকে নিয়োগ এবং মাত্র আট মাসের মাথায় তাকে বিদায়—এই পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল বিশেষভাবে বিশৃঙ্খল ও রহস্যময় বলে মনে করছে নিউইয়র্ক গণমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিক।
কার্লো আনচেলত্তির জায়গায় গত গ্রীষ্মে ক্লাব বিশ্বকাপের আগেই রিয়ালের ডাগআউটে বসেন আলোনসো। বায়ার লেভারকুজেনে সফলভাবে প্রয়োগ করা তার হাই-প্রেসিং ও উচ্চ গতির ফুটবল দর্শন বাস্তবায়নের জন্য ক্লাবের শীর্ষ মহলের সমর্থনও ছিল। সেই লক্ষ্যেই গত গ্রীষ্মে প্রায় ১৮ কোটি ইউরোর ট্রান্সফার ব্যয় করে রিয়াল—ডিন হুইজেনের পেছনে ৬২.৫ মিলিয়ন ইউরো, আলভারো কারেরাসের জন্য ৫০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করা হয়—যাতে আলোনসোর কৌশলগত ও টেকনিক্যাল ভাবনার সঙ্গে মানানসই তরুণ খেলোয়াড়রা দলে আসে।
একই সঙ্গে স্কোয়াডে শৃঙ্খলা ও কাঠামো ফিরিয়ে আনার কথাও ভাবা হয়েছিল। বিশেষ করে আনচেলত্তির দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দিকে যাদের ‘অতিরিক্ত ছাড়’ দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছিল, সেই তারকা খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণে আনাই ছিল উদ্দেশ্য। ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত রিয়ালের হয়ে খেলা আলোনসোর অভিজ্ঞতা ড্রেসিংরুম ও বোর্ডরুম—দুটো সামলাতেই কাজে দেবে, এমন প্রত্যাশাও ছিল।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় রিয়াল মাদ্রিদে দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব। ক্লাবের ভেতরে ক্ষমতার এমন কেন্দ্রীকরণ হয়েছে যে, পেরেজ ছাড়া রিয়ালের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে—তা কল্পনাও করা কঠিন।
এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ আসে অক্টোবরে লা লিগায় বার্সেলোনার বিপক্ষে ২-১ গোলের ঘরের মাঠের জয়ে। ম্যাচের শেষ দিকে সমতা ফেরানোর চেষ্টা করছিল বার্সা। তখন রক্ষণে ফিরতে অনীহা দেখানোয় ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে তুলে নিয়ে আলোনসো নামান রদ্রিগোকে—রক্ষণে ভারসাম্য আনার জন্য। অন্য যেকোনো ক্লাবে এটি হতো যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত, কিন্তু রিয়ালে সেটিই আলোনসোর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
ম্যানেজারের আচরণে আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ভিনিসিয়ুস প্রকাশ্যেই অসন্তোষ দেখান। ক্লাব কর্তৃপক্ষ কোনো শাস্তি না দেওয়ায় বার্নাব্যুতে সবার কাছে বার্তা স্পষ্ট হয়ে যায়—তারকা খেলোয়াড়রা কোচের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও বা তাকে অমান্য করলেও তার ফল ভোগ করতে হয় না।
এরপর শুরু হয় গুঞ্জন, পারফরম্যান্সে ভাটা। লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হার, সেল্তা ভিগোর কাছে ঘরের মাঠে ২-০ গোলের লজ্জাজনক পরাজয়, এমনকি তৃতীয় স্তরের তালাভেরা দে লা রেইনার বিপক্ষে কষ্টসাধ্য ৩-২ কোপা দেল রে জয়—সব মিলিয়ে চাপ বাড়তেই থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা সামলে নিয়েছিলেন আলোনসো। নিজের কড়া নির্দেশনা শিথিল করে তিনি আরও বাস্তববাদী হন, কৌশল বদলে আনচেলত্তির সময়কার মতো কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবল খেলাতে শুরু করেন দলকে। সেভিয়া ও রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে জয়ের সময় ভিনিসিয়ুসসহ হতাশাজনক পারফরম্যান্স করা খেলোয়াড়দের দর্শকদের দুয়োধ্বনি যেন পরোক্ষভাবে কোচের পক্ষেই দাঁড়িয়েছিল।
এমনকি রবিবার স্প্যানিশ সুপারকোপার ফাইনালে বার্সেলোনার কাছে ৩-২ ব্যবধানে হারার পরও অনেকের ধারণা ছিল, আলোনসো আরও সময় পাবেন। সৌদি আরব থেকে মাদ্রিদে ফেরার সময় ক্লাবের ভেতরের অনেকেই ভাবছিলেন, কোচ বদল আসন্ন নয়। কিন্তু রিয়ালে শেষ পর্যন্ত একজনের মতামতই চূড়ান্ত—প্রেসিডেন্ট। অতীতেও নতুন কোচদের ক্ষেত্রে পেরেজ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ২০১৫-১৬ মৌসুমে রাফায়েল বেনিতেজ ছিলেন মাত্র ছয় মাস, ২০১৮ সালে হুলেন লোপেতেগুই টিকেছিলেন ১৪ ম্যাচ।
আলোনসো নিজেও খুব একটা ভালো ছাপ রাখতে পারেননি। নিজের চাওয়া অনুযায়ী দলকে খেলাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তার সংযত ব্যক্তিত্ব ও অতিরিক্ত টেকনোক্র্যাটিক দৃষ্টিভঙ্গি ড্রেসিংরুম ও বোর্ডরুম—দুটোতেই সমস্যা তৈরি করে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিজের দর্শন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েও হয়তো তিনি আফসোস করবেন।
এদিকে ফিটনেস ও মেডিক্যাল বিভাগে চলমান বিশৃঙ্খলাও দেখিয়ে দেয়—প্রথম দলের কোচের ক্ষমতা কতটা সীমিত। নিজের ফিটনেস বিশেষজ্ঞ নিয়ে এলেও আলোনসোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় পেরেজের ঘনিষ্ঠ আন্তোনিও পিন্তুসকে। তার ওপর আবার অভিজ্ঞ চিকিৎসক নিকো মিহিচের প্রত্যাবর্তন—সব মিলিয়ে নিয়ন্ত্রণ কোচের হাতে ছিল না। এর ফল হিসেবে কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো খেলোয়াড়দের ইনজুরিও বড় সমস্যায় পরিণত হয়।
এই ব্যবস্থাপনা অদ্ভুত মনে হলেও, গত ২৫ বছরে সাফল্যের দিক থেকে রিয়ালকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কঠিন। পেরেজের দুই মেয়াদেই এসেছে ক্লাবের রেকর্ড ১৫টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মধ্যে সাতটি।
আলোনসোর বিদায়ের পরই ঘোষণা আসে—রিজার্ভ দল থেকে উঠে দায়িত্ব নিচ্ছেন তার সাবেক সতীর্থ আলভারো আরবেলোয়া। ধারণা করা হচ্ছে, পিন্তুসও আবার নিয়মিতভাবে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করবেন। ক্লাবের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য আর প্রেসিডেন্টের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ায় পরিচিত আরবেলোয়া শীর্ষ পর্যায়ে দল গড়তে পারবেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কাবিলার নোয়াখালীকে প্লে-অফে যেতে যা করতে হবে
'যেমনটা চেয়েছি তেমন হয়নি', বরখাস্তের পর মুখ খুললেন জাবি আলোনসো