কোনো ধরনের জনমত বা বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণ ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। মহাপরিকল্পনায় বিদ্যুতের চাহিদা অত্যধিক দেখানো হয়েছে। নেপাল ও ভুটান থেকে সাশ্রয়ীমূল্যে বিদ্যুৎ আনার সুযোগ পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এমন অভিযোগ তুলেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। বিশেষ কোনো দেশের স্বার্থে তড়িঘড়ি করে অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে কি না সেই প্রশ্নও তুলেছে গবেষণা সংস্থাটি। সেই সঙ্গে সিপিডি সুপারিশ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার এই খসড়া পুনর্বিবেচনা করবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬-৫০) নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সিপিডি এ কথা বলেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানম-িতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রিওতি। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মেহেদী হাসান শামীম, আবরার আহমেদ, আতিকুজ্জামান সাজিদসহ অন্য গবেষকরা।
মূল প্রবন্ধে সিপিডি উল্লেখ করেছে, খসড়া মহাপরিকল্পনায় ২০৫০ সালে বিদ্যুতের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬০ হাজার মেগাওয়াট। অথচ তারা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছিলেন এর অর্ধেক, অর্থাৎ ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ দরকার হবে না। খসড়া মহাপরিকল্পনায় এলএনজি অবকাঠামোকে বিপুল বিনিয়োগের জন্য সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির মধ্যে ৪৫ শতাংশ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি থেকে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ২৯ শতাংশে নেমে আসবে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমানে ১৭ শতাংশ, যা ২০৫০ সালের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশে নামানো হবে। সরকার একটি ২৪ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ২০৫০ সালের মধ্যে সৌর বা সোলার বিদ্যুতের উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩২ গিগাওয়াট। তবে মহাপরিকল্পনায় দেখা যায়, ২০৪০ সালের আগে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে বড় কোনো প্রকল্প বা উদ্যোগ নেই। নতুন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে প্রায় ৭০ থেকে ৮৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। বিদ্যুৎ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ১০৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এদিকে নেপাল ও ভুটান থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ আনার সুযোগ পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়নও খসড়া পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
সিপিডি আরও জানিয়েছে, আগের মহাপরিকল্পনায় এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। এখন খসড়া মহাপরিকল্পনায় ধরা হয়েছে ২৭ বিলিয়ন ডলার। এ ধরনের প্ল্যান বা পলিসি শুধু অর্থনৈতিক ডকুমেন্ট নয়। এটা এক ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ডকুমেন্ট। কারণ, অনেক জায়গায় সরকারকে সমঝোতা করতে হয়, ছাড় দিতে হয়। কিন্তু বৃহত্তর যে লক্ষ্য, সে জায়গা থেকে সরকার সাধারণত পিছপা হন না। কিন্তু এই ডকুমেন্ট (খসড়া মহাপরিকল্পনা) দেখে সিপিডি মনে করছে, এটার পেছনে প্রেশার গ্রুপগুলোর প্রেশার রয়েছে। এখানে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো কোনো জায়গায় ছাড় দিয়েছে বা নতজানু হয়েছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, একটি উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশে, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া গবেষণামূলক হওয়ার কথা, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি দেশের লক্ষ্যের সঙ্গে তা সাযুজ্যপূর্ণ হওয়ার কথা, যেখানে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সম্পৃক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা ছাড়া, কোনো ধরনের বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এ ধরনের একটি কাজ (খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রস্তুত) গোপনে শেষ করার বিষয়টি আগের সরকারের আচরণকে মনে করিয়ে দেয় বলে মন্তব্য করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিভিন্ন ধরনের যে সংকট চলছে, সেই সংকট সমাধানের বিষয়গুলোও যে বিবেচনায় নেওয়ার কথা এই খসড়া প্রণয়নে তার খুবই ম্রিয়মাণ উপস্থিতি বা বলতে গেলে সেগুলো আসলে এক অর্থে অনুপস্থিত। খসড়া মহাপরিকল্পনা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনার যে খসড়া, তা ত্রুটিপূর্ণ। যা অংশগ্রহণমূলক নয় এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ এখানে রক্ষা করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, কেন তাড়াহুড়া করে এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ, কেন এই তোড়জোড়? কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বশর্তের অংশ হিসেবে কি এ রকম কিছু করা হচ্ছে?’
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে কী ধরনের বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে এই সংস্থা (সিপিডি) কাজ করেছে, তা সবাই জানে। বর্তমান সরকারের সময়ে কিছুটা সহযোগিতা নিয়ে তারা কাজ করছিল। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে একটি খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয় সিপিডি জানে না। এটি সিপিডির জন্য এক ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি।’
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রশ্ন রেখে বলেন, কেন এ রকম একটি মহাপরিকল্পনার মিশন-ভিশনে যথাযথভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতিফলন নেই? কেন এখানে রিসোর্স অপটিমাইজেশনের নাম করে অভ্যন্তরীণ কয়লাকে ব্যবহার করার জন্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে? কেন সোলারের নাম ব্যবহার করে সোলারের বাইরে অন্যান্য যে জ্বালানি আছে, যেগুলো কার্বন নির্গমন করে, সেগুলো সোলারের ভেতরে যুক্ত করা হয়েছে?
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, তারা জানতে পারছেন যে শিগগির দুটি বড় চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট চুক্তি হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা। উভয় দেশ থেকে জ্বালানি বিষয়ে একটা বড় ধরনের অঙ্গীকার চাওয়া হয়েছে বলে তাদের কাছে ইঙ্গিত আছে। সুতরাং এই ডকুমেন্ট (খসড়া মহাপরিকল্পনা) তৈরির ক্ষেত্রে এসব দেশের বা চুক্তিগুলোর একটি প্রভাব থাকা অমূলক নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারকে এই মহাপরিকল্পনার কার্যক্রম স্থগিত করার আহ্বান জানিয়ে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘নতুন নির্বাচিত সরকারের বিদ্যুৎ ও জ¦লাানি বিষয়ে নতুন পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’
