কর আদায় নয় আহরণ

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

শব্দের মধ্যে যে উদ্দেশ্য ও বিধেয় লুকিয়ে থাকে, সেটিই শব্দের প্রকৃত অর্থ নির্ধারক। শব্দের ভাবগত, ভাষাগত এবং ব্যুৎপত্তিগত অর্থ, স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করতে পারে। কিন্তু মূল বা ধাতুগত স্বকীয়তা ঠিক থাকে সর্বদা, সর্বত্র। ‘আদায়’ শব্দটি আরবি ‘আদা’ ধাতুমূল থেকে উৎপত্তি। মূল অর্থ পালন, সম্পাদন বা সাধন করা। সংস্কৃতে ‘আ’ প্রত্যয়ের সঙ্গে (‘দা’ ধাতুযোগে ‘আদায়’ শব্দটি গঠিত। ‘দা’ ধাতুমূল দায়বদ্ধতার প্রতীক। প্রজা তার মালিক বা রাজা অথবা রাষ্ট্রের কাছে দেয় পরিশোধে দায়বদ্ধ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধমে স্বাধীন-সার্বভৈৗমত্ব লাভের পূর্ব পর্যন্ত, অধিকাংশ সময় বিদেশি শাসনের অধীনে থেকেছে দেশ। প্রাচীনকাল থেকেই খাজনা বা নজরানা সংগ্রহ কার্যক্রমে, জোর জবরদস্তি বা বাধ্য করা অর্থে, ‘আদায়’ শব্দটি ব্যবহার হয়ে এসেছে। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক অধিগ্রহণকৃত, এদেশীয় ভূমির মালিকানাসূত্রে খাজনা সংগ্রহের দায়িত্ব জমিদার শ্রেণির কাছে অর্পিত হয়। জমিদাররা জমির প্রকৃত মালিক ছিল না। তারা জমির চাষবাসেও ছিল না। শুধু তারা কোম্পানির হয়ে খাজনা সংগ্রাহক ছিল মাত্র। এই সংগ্রহ কাজে কোম্পানিকে দেয় পরিশোধের পর উদ্বৃত্ত কমিশন হিসেবে প্রাপ্তির প্রত্যাশী ছিল মধ্যস্বত্বভোগী এই সিন্ডিকেট। ফলে রায়তের সঙ্গে খাজনা সংগ্রহ কর্মে, তাদের সম্পর্ক শেষমেশ জুলুম বা জোর জবরদস্তির পর্যায়ে পৌঁছাত।

জমিতে ফসল হলো কিনা, রায়ত চাষবাস করে টিকে থাকতে পারবে বা পারছে কিনা, এটা জমিদারদের বিবেচনার বিষয় ছিল না। আর কোম্পানি বিষয়টি অবশ্যই দেখে বা জেনেও না জানার ভান করত। কেননা তারা তুষ্ট থাকত রাজস্ব পেয়ে, প্রজার সুযোগ-সুবিধা দেখার বিষয়টি তারা আমলে নিতে প্রস্তুত ছিল না। খাজনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘আদায়’ শব্দটি সেভাবে একটা জোর জুলুম, অত্যাচার, আত্মসাতের প্রতিভু হিসেবে বিদ্যমান হয়ে দাঁড়ায়। একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী দেশ ও পরিবেশে রাষ্ট্রকে দেয় ‘আদায়ের’ ঔপনিবেশিক আমলের এসব মানসিকতা অব্যাহত থাকা যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে না। নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র কর্তৃক আইনের আওতায় করারোপ আর রাষ্ট্রকে সেই কর পরিশোধের বিষয়টি এ নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, ‘আদায়’ শব্দটা ততটা যুৎসই নয়। যতটা ভূমি কর বা খাজনার ক্ষেত্রে খাটে। আয়করের দর্শন হলো, রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাস করে নির্ধারিত পরিমাণের বেশি আয় বা সম্পদ অর্জিত হলে, রাষ্ট্র তার একটা নির্দিষ্ট অংশ ‘সমাজে সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থায় সমতা বিধান এবং আয় উপার্জনের পরিবেশ সৃজন তথা অবকাঠামো নির্মাণ বাবদ আয় উপার্জনের পরিমাণভেদে একটা হিস্যা’ হিসেবে প্রাপ্য হিসেবে চাইতে পারে। ভূমি করের ক্ষেত্রে আগে রাষ্ট্র ভূমি বরাদ্দ দেয় এবং তার ভিত্তিতে খাজনা দাবি করে। এখানে লেনদেন প্রকাশ্য, সুতরাং দাবি বা আদায়ের যৌক্তিকতা সেভাবেই আসে। কিন্তু আয়করের ক্ষেত্রে লেনদেন অপ্রকাশ্য, রাষ্ট্র সৃজিত সুযোগ-সুবিধা সবাই ভোগ করলেও, সবাই আয় বা সম্পদ অর্জন করতে পারে না। মেধা, বুদ্ধি, পরিশ্রম দিয়ে সম্পদ অর্জন করতে হয়। অতএব সেই আয়ের ওপর রাষ্ট্রের যে দাবি, তা নাগরিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে প্রদেয়। এখানে রাষ্ট্রের পক্ষে তা ‘আদায়ের’ যৌক্তিকতা অনেকটা গৌণ। 

আয়কর দেওয়ার মতো আয় যে নাগরিকের আছে, তিনি রাষ্ট্রকে দেয় কর পরিশোধ করবেন স্বেচ্ছায়, আইনগত বাধ্যবাধকতা পালন করে, নাগরিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে। তবে যদি তিনি তা পরিশোধে গড়িমসি করেন, এড়িয়ে চলেন বা অসাধু পন্থা অবলম্বন করেন তাহলে আইনের আওতায় রাষ্ট্রের প্রাপ্য উদ্ধারে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। কেননা কেউ কর ফাঁকি দিলে, তা উদ্ধারে ব্যর্থতার দায়ভাগ আহরণকারীর। কারণ তাদের এ অপারগতায় সমাজে ন্যায়-অন্যায়, বৈধ-অবৈধ অসম অবস্থানে চলে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে তো বটেই, সমাজে সম্পদের অর্জন বণ্টনে বৈষম্য সৃজিত হতে পারে। এর ফলে ভারসাম্য বিনষ্ট হতে পারে, সমাজ ও অর্থনীতিতে। এ নিরিখেই সব করদাতার সঙ্গে ‘আদায়’জনিত মনোভাব পোষণ বা ক্ষমতার প্রয়োগ বা সে ধরনের পরিবেশ সৃজন যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। সীমারেখা মেনে চলা জরুরি এ জন্য যে, তা না হলে কর আরোপ, আহরণ, প্রদান ও পরিশোধের ক্ষেত্রে ভিন্ন নেতিবাচক পরিস্থিতি উদ্ভব হতে পারে। করারোপ ও আহরণকারীর সঙ্গে করদাতার সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস, সংশয়, সন্দেহ দানা বাঁধতে পারে বা আস্থায় চিড় ধরতে পাারে। এর ফলে পরস্পরকে এড়িয়ে চলা, জোর জবরদস্তি, পক্ষপাতিত্ব বা আঁতাতের মতো অনেক কিছু ঘটতে পারে। স্বচ্ছতার স্থলে অস্বচ্ছতার অনুপ্রবেশে কর আহরণের মতো  রাজস্ব আয়ের দেহে সিস্টেম লস বা ইনফরমাল রেভিনিউরূপী ‘সুগারের’ মাত্রা বেড়ে অর্থনীতি ‘ডায়াবেটিসে’ আক্রান্ত হতে পারে ‘সাইলেন্ট কিলার’ নামে পরিচিত যে রোগটি দেহে বহু ব্যধির আহ্বায়ক। এ দেশে আয়কর আইন প্রবর্তন হওয়ার সমসাময়িক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, একটা ঔপনিবেশিক সরকার এর প্রবর্তক আর কর সংগ্রহ  ('collection of taxes’ আইনের ভাষ্যে শব্দটি এভাবেই আছে) কার্যক্রমটি সে সময়কার ‘আদায়’ মানসিকতা দ্বারা শাসিত। শাসক আর শাসিতের মধ্যে কর আরোপের আর আদায়ের প্রসঙ্গটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের দর্শনের ভিত্তি রচনার পরিবর্তে রাজা, প্রজা, প্রভু, ভৃত্য, বিদেশি বেনিয়া আর দেশীয় (native) প্রতিপক্ষ সুলভ। এ পরিবেশে কর বা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া, সংশয় সন্দেহ, জোর জবরদস্তি কিংবা পাকড়াওকরণের চিন্তাচেতনায় Collection of tax (or revenue) হয়ে ওঠে আদায় করার বিষয়। রাজস্ব আহরণকারীর মনোভাব আইনের দৃষ্টিভঙ্গিসঞ্জাত ‘আদায়কারী’ প্রতিভূ হিসেবে প্রতিভাত হয়। রাজস্ব বিভাগের কর্মীরা সামাজিকভাবে সে পরিচয় পেয়ে যান এবং তাদের এড়িয়ে চলার সুকৌশল বাতাবরণ তৈরির জন্য নানা পেশাদারত্বের উদ্ভব ঘটে সেভাবেই। রাজস্ব প্রশাসনে কর ‘আদায়’ শব্দটিকে জোর-জবরদিস্ত  ও  জুলুম (extortion), দখল, আত্মসাৎ, ফাঁকি (evade), সংশয়, সন্দেহের পাড়া থেকে বের করে এনে, ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে তাকে স্বচ্ছ, সুশোভন, পারস্পরিক উপলব্ধির মাধ্যমে স্বেচ্ছা প্রণোদনের ঘাটে ভেড়াবার জন্য ‘আদায়ের’ পরিবর্তেই ‘আহরণ’  (collection of tax or  revenue)। এ আরোহণের আহ্বান জানানো এবং এটি যাতে শুধু শব্দের পাড়া পরিবর্তন না হয়, এটি মানসিকতায়ও যাতে স্থায়ী বাসা বরাদ্দ পায়, তার জন্য আইনের চোখের সংস্কার ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ার চিকিৎসার উদ্যোগ আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন।

বাঞ্ছিত পরিমাণ আয়কর আহরণ শুধু সরকারের রাজস্ব তহবিলের স্ফীতির জন্য নয়। সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা সুষমকরণের দ্বারা সামাজিক সুবিচার সুনিশ্চিতকরণে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও অঞ্চলগত উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণের জন্য জরুরি। দেশকে স্বয়ম্ভরের গৌরবে গড়তে ও পরনির্ভরতার নিগড় থেকে বের করে আনতে, ‘আয়কর’ অন্যতম প্রভাবক ভূমিকা পালন করবে। আয়কর বিভাগের প্রতিটি প্রয়াসে তাই থাকা চাই, বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার সম্মিলনে উন্মোচিত আত্মবিশ্বাস, সহযোগিতা সঞ্জাত মনোভঙ্গী ভজন, পদ্ধতি সহজীকরণ এবং করদাতার আস্থা অর্জনের অয়োময় প্রত্যয়। ২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো বৃত্তাবদ্ধ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে, কর রাজস্ব আহরণের সাফল্য লাভের পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি এনবিআরকে। এডিপির বাস্তবায়ন পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে স্থিরিকৃত আয়কর অধিক পরিমাণে আহরণের, একটা অবারিত সুযোগ ও সম্পর্ক আছে। তবে বলে রাখা ভালো, এখনো আয়কর কর রাজস্ব প্রাপ্তির পরিবারে তৃতীয় শরিক, অর্থনীতির আকার অবয়ব চেহারা ও চরিত্র অনুযায়ী আমদানি শুল্ক (আশু)  ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) কে টপকিয়ে আয়করের অবস্থান এক নম্বর হওয়া বাঞ্ছনীয়, নয় কি? সার্বিক রাজস্ব আয়ে আশুর হিস্যা  এখনো শতকরা ৩৭ আর মূসক ৩৫। আয়করকে মোড়লীপনায় আসতে হলে, আরও জোরে চালাতে হবে পা, হতে হবে আরও গতিশীল, চাই অধিকতর সমন্বিত উদ্যোগ। নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি পুরনো উদ্যোগের সালতামামী বা ফলো আপ আবশ্যক হবে। দেশে যারা এক কোটির বেশি ক্রেডিট কার্ডধারী আছেন, আছেন প্রায় সমসংখ্যক গাড়িবাড়ির মালিক, তাদের কাছে যাওয়ার সর্বশেষ অবস্থা কী? আয়করদাতা যাতে নিজেই রিটার্ন ফরম পূরণ করতে পারে, সে ব্যাপারে যে সহায়ক নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছিল, প্রচারিত হয়েছিল সিটিজেন চার্টার তা কি গণঅবিহিতির অবয়বে আছে এখনো? আগেও যেসব কর তথ্যকেন্দ্র, সেবাকেন্দ্র খোলা হয়েছিল প্রকল্পের প্রেরণায়, সেগুলোর কার্যকারিতা থেমে গেছে কিনা তা দেখার অবকাশ রয়েছে। একই কার্যক্রম বারবার ‘নতুন’ করে চালু করলে ভিন্ন বার্তা পৌঁছাতে পারে টার্গেট গ্রুপের কাছে। কর মেলায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে কর দাতাদের আগ্রহ বাড়ছে, অনেকেই ঝামেলামুক্ত উপায়ে বা পরিবেশে কর দিতে চান। তারা কর দেওয়াকে দায়িত্ব মনে করছেন, তাদের এই আগ্রহকে ধরে রাখতে হবে, তাদের উদ্বোধিত দায়িত্ববোধের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, তাদের আগ্রহকে সমীহ করতে হবে।

করদাতাদের উদ্বুদ্ধকরণে প্রচার-প্রচারণার কাজে আগে তেমন কোনো বরাদ্দ ছিল না, কর আহরণের ব্যাপারে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক থেকে অতীতে বর্তমানের মতো প্রযতœ প্রদানের নজির ছিল না, এখন এসব সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে সেই ১৯৯০ সাল থেকে এ যাবৎ ১৫-১৬ প্রকল্প (বিদেশি সাহায্যপুষ্ট, বিদেশি বিশেষজ্ঞের ভারে ন্যুজ) বাস্তবায়ন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড শুধু অটোমেশন, অনলাইনিং, সিট্রমলাইনিং, স্ট্রেনদেনিংয়ের জন্য। বিশ বছরে সেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দ্বারা অর্জিত অগ্রগতি দৃশ্যগোচর না হোক অন্তত অনুভব সম্ভব হবে যদি দেখা যায় সবার মাইন্ডসেট ও কর্মকুশলতায় গুণগত পরিবর্তন এসেছে। তবে এটাও ঠিক, বর্তমানে যে অব্যাহত অগ্রগতি, তার পেছনে সেসব প্রয়াসের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি এবং তা নেপথ্য প্রেরণা হিসেবে যে কাজ করছে তা অনস্বীকার্য। একই সঙ্গে সম্মানিত করদাতাদের সার্বিক সহযোগিতা, তাদের অভূতপূর্ব দায়িত্ববোধের উদ্বোধন, জটিল কর আইনগুলো সহজীকরণের প্রতি তাদের আকিঞ্চন প্রত্যাশাকে সাধুবাদ জানাতে হয়।

লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত