হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া তীব্র সংঘাতের মাঝেই ইরানের সঙ্গে আবারও আলোচনায় বসার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন তেহরানের আলোচনার প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। তবে ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গত ১৭ জুনের যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ইতিমধ্যে ভেস্তে গেছে।
অবশ্য ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার এমন কোনো অনুরোধের কথা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই দুই পক্ষ থেকে প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান আমাদের ‘আলোচনা’ চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছে। আমরা এতে সম্মত হয়েছি। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ!’
ইরানের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা না হলেও শুক্রবার দেশটির প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবফ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তাদের কর্মকর্তারা এখনো কূটনৈতিক পথ খোলা রাখতে ইচ্ছুক। তিনি বলেন, ‘আমেরিকানরা যেকোনো মুহূর্তে সমঝোতার খেলাপ করলে আমরা পূর্ণমাত্রায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রস্তুত। আমরা তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে থেকে ইরানি জনগণের অধিকার রক্ষা করব।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘যুদ্ধ বন্ধ করা বিশ্বের সব দেশের জন্য একটি অগ্রাধিকার, তবে সবাইকে জানতে হবে যে ইরান কখনোই আত্মসমর্পণ করে এই সংঘাতের অবসান ঘটাবে না।’
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে গত দুই দিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। এর মাঝেই ট্রাম্পের এই বক্তব্য এল। এর আগে জুনের শেষের দিকেও ড্রোনের মাধ্যমে কনটেইনার জাহাজে হামলার অভিযোগ এনে ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থা ‘ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড’ জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার থেকে তারা ইরানের প্রায় ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইরানও এই অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
চলতি সপ্তাহের এই সংঘাত গত ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই স্মারকে সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌঅবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
শুক্রবারের পোস্টে ট্রাম্প স্পষ্ট করেননি যে এই আলোচনা নতুন করে যুদ্ধ থামানোর জন্য হবে, নাকি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ৬০ দিনের মধ্যে যেসব বিষয় সমাধানের কথা ছিল তা নিয়ে হবে। ওই বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, ইরানের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা অর্থ অবমুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ব্যবস্থা।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ট্রাম্প বলেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে চায় না। যদিও একই সময়ে তিনি ইরানের তেল ও পানি অবকাঠামোতে হামলা, খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং পুনরায় নৌঅবরোধ আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
এদিকে উত্তেজনা কমাতে এবং কাতার বা পাকিস্তানে একটি বৃহত্তর আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে কাতারের কর্মকর্তারা ইরান সফর করছেন বলে জানা গেছে। কাতারের রাজধানী দোহা থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি এই তথ্য জানিয়েছেন। তবে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জসিম আল থানি শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানান, মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক ফোনালাপে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষকেই তাদের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
বর্তমান উত্তেজনা বৃদ্ধির আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে জুনের সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছিল। ইরানের কর্মকর্তাদের দাবি, এই স্মারক অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিয়ম নির্ধারণের অধিকার তেহরানের রয়েছে। ফলে নিয়ম না মানা জাহাজে হামলা চালানো বৈধ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই চুক্তি অনুযায়ী ইরানকে সব জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।
তবে এত কিছুর পরও ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়েরই কূটনৈতিক পথে ফেরার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় নয়, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অবরুদ্ধ অর্থ ফেরত পাওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য তেহরানেরও এই আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলফিরেজ শেয়ার্স বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে ন্যূনতম বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা না গেলে এই আলোচনা থেকে খুব বেশি কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় অনেক দিক থেকেই এই আলোচনা কেবলই আনুষ্ঠানিকতা। যতক্ষণ না বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনে বাস্তবসম্মত কোনো অগ্রগতি হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আলোচনা থেকে কোনো ফলাফল আসার সম্ভাবনা কম।’
সূত্র: আল জাজিরা