২০১৬ সালে রাজনীতিতে নবাগত হিসেবে নাম লিখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতে বাজিমাত করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের কেন্দ্রে আবির্ভূত হওয়ার পর থেকে নানা সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে চমকে দিতে শুরু করেন ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ট্রাম্প। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শাসনামলকে ইতিবাচক-নেতিবাচক দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই বর্ণনা করা যায়। উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির বদল ঘটিয়ে জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দেওয়া (কোনো রিপাবলিকান/ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট এ সিদ্ধান্তের পথে হাঁটেননি); কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী অভিহিত করে বিভিন্ন সংস্থা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ দেশ ইরাক ও এশিয়ার আরেক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার করে প্রশংসিতও হয়েছেন। তবে সর্বোপরি সে দফাতেই ট্রাম্প নিজেকে একজন ক্ষেপাটে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জাহির করতে সমর্থ হয়েছিলেন। যার চূড়ান্ত প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবার জয় পেয়ে হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের পর।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থাকে কার্যত ভেঙে দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র রূপকল্প বাস্তবায়নে রাষ্ট্র পরিচালনার চিরাচরিত পদ্ধতিগুলো ভেঙে ‘একলা চলো’ নীতি গ্রহণ করেছেন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে না, সেখান থেকে পিঠটান দিয়েছেন; আবার যেখানে ওয়াশিংটনের লাভের পাল্লা ভারীর সুযোগ আছে সেখানে অবলীলায় গুরুত্বারোপ করেছেন (এমনকি মিত্রকে শত্রুতে পরিণত করে হলেও)। তার নেওয়া একের পর এক আগ্রাসী পদক্ষেপ বিশ্বরাজনীতিকে এমন এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আগে কখনো দেখা যায়নি। দ্বিতীয়বার ক্ষমতা ফিরেই ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন। কিন্তু বাস্তবতা বলে ট্রাম্প নিজের মুখের কথার বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তবে সেখানে সফল না হলেও দুই বছরের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলা ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছেন। এ ছাড়া বিশ্ব জুড়ে বেশ কয়েকটি দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অবসান ঘটানোর মধ্য দিয়ে নিজেকে শান্ত দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। নগ্নভাবে এসব যুদ্ধ বন্ধের কৃতিত্ব চেয়েছেন, এমনকি সাতটি যুদ্ধ থামানোর কথা ঘোষণা করে প্রকাশ্যে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত বলে দাবি তুলেছেন। সে পুরস্কার না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করতে পিছপা হননি যুক্তরাষ্ট্রের মহাক্ষমতাধর এই প্রেসিডেন্ট। তবে বিশ্লেষকরা এটিকে ট্রাম্পের কূটনৈতিক সফলতা হিসেবে দেখেননি; উপরন্তু এটিকে ট্রাম্পের প্রতি সমীহা হিসেবে দেখছেন। কেননা গত বছর এপ্রিলে মিত্র-শত্রু নির্বিশেষে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের ওপর ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বিশ্ববাণিজ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছেন। এক কথায় বললে বাণিজ্যকে কার্যত তিনি কূটনীতির হাতিয়ারে পরিণত করেছেন।
ট্রাম্প একদিকে নিজেকে যেমন তথাকথিত ‘প্রধান শান্তিদূত’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রয়াস চালিয়েছেন, অন্যদিকে দ্বন্দ্ব উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রেও অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে ‘খলনায়ক’ উপাধিও পেয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল অবস্থার পেছনে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ইসরায়েলের; আর সেই তেল আবিবকে নগ্নভাবে সমর্থন দিয়ে গাজায় গণহত্যায় সহযোগিতা করেছেন (যদিও যুদ্ধবিরতি চুক্তির আগে নেতানিয়াহুর সঙ্গে খানিকটা দূরত্বও বেড়েছিল)। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেনে ইসরায়েলি আগ্রাসনকে উৎসাহিত করেছেন। ইসরায়েলের দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে ইরানের পরমাণু স্থাপনা লক্ষ্য করে বিধ্বংসী বাংকার ব্লাস্ট বোমা ফেলেছেন। তবে বিশ্বরাজনীতি ট্রাম্প সবচেয়ে বাজে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন চলতি বছরের শুরুতে এক বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার মাধ্যমে। আর রাজনৈতিক শিষ্টাচার বা ভব্যতা ট্রাম্প চলতি মেয়াদের শুরু থেকে বাদ দিয়েছেন। গত বছরের শুরুতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনেই অপমান করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সঙ্গেও একই কাণ্ড ঘটান। পরবর্তী সময়েও অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে ত্রুটিপূর্ণ ও বেফাঁস মন্তব্যের ধারা সফলতার সঙ্গে ধরে রেখেছেন।
ক্ষমতায় আসার পর চীনের পণ্যে শুল্ক বৃদ্ধি করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেন, কোন দেশের সঙ্গে কত বাণিজ্য ঘাটতি আছে, তা বের করে পাল্টা শুল্ক আরোপের। ফলে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের এক ঐতিহাসিক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন তিনি। তবে সেখানেই নাটকের যবনিকাপাত ঘটাননি ট্রাম্প। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি এই অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক তিন মাসের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দেন। এ সময়ের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা বলেন তিনি। হঠাৎ করেই ট্রাম্পের শুল্কের খড়গের শিকার হওয়ায় দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজতে শুরু করে। এ সময়ের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানরা ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। বিষয়টি যে তিনি উপভোগ করেছেন, সেটা ট্রাম্প তার আচরণেই বুঝিয়ে দিয়েছেন। রাখঢাক না রেখে ট্রাম্প বলেন, বিশ্বনেতারা এখন আমাকে ‘স্যার স্যার’ করছেন; তারা আমাদের সঙ্গে চুক্তি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ট্রাম্পের এই শুল্ক বিশ্ববাণিজ্যকে টালমাটাল করে তোলে। প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে কোণঠাসা করতে কয়েক দফায় শুষ্ক বাড়ানোর পর বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের তীব্র শঙ্কা তৈরি হয়। তবে ট্রাম্পের এই শুল্ক মোকাবিলা করে চলতি বছর চীনের অর্থনীতি রেকর্ড প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, যার ফলে বলা যায় ট্রাম্পের কৌশল শতভাগ সফলতা আনতে পারেনি।
গত এক বছরে বিশ্বব্যাপী অন্তত ৯টি যুদ্ধ-সংঘাত বন্ধের কৃতিত্ব নিজেকে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ, ইসরায়েল-ইরান, ডিআর কঙ্গো-রুয়ান্ডা, ভারত-পাকিস্তান, সার্বিয়া-কসোভো, হামাস-ইসরায়েল, মিসর-ইথিওপিয়া, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান এবং কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ডের মধ্যে সংঘাত মীমাংসায় ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ইসরায়েল-ইরানের মধ্যে গত বছর ১৩ জুন শুরু হওয়া যুদ্ধকে ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ বলে নিজেই তকমা সেঁটে দেন ট্রাম্প। ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলি বিমান হামলার মধ্য দিয়ে ওই সংঘাত শুরু হয়। পরে আবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাতেই অস্ত্রবিরতি হয়। সে বছর কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার জের ধরে মে মাসে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তান। এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ বেঁধে যাওয়া নিয়ে বিশ্বে যখন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা, তখনই অকস্মাৎ ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুদেশের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। পরে জুন মাসে ওয়াশিংটনে বসে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে ডিআর কঙ্গো ও রুয়ান্ডা। এর মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে বলে দাবি করেন ট্রাম্প। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে পানামা খাল ও গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ ও দেশটির তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ, জাতিসংঘের ৩১টিরও বেশি সংস্থাসহ অন্তত ৬৬টি সংস্থা থেকে নাম প্রত্যাহারসহ ট্রাম্প এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা বিশ্ব ব্যবস্থার ভিত্তিতে জোরেশোরে নাড়া দিয়েছে।
শুধু দেশের বাইরে নয়, ভেতরেও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগ উঠেছে। অবৈধ অভিবাসী বিতাড়নের নামে দেশ জুড়ে ধরপাকড় বাড়িয়েছে তার প্রশাসন। অনেক ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের অভিবাসী অভিযান চালানো বাহিনী আইসিইর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ আছে। সবশেষ মিনিয়াপোলিসে অভিবাসনবিরোধী অভিযানে এক অভিবাসন কর্মকর্তা রেনে গুড (৩৭) নামের এক নারীকে গুলি করে হত্যা করেন। এ ঘটনায় ট্রাম্প কিংবা তার প্রশাসন ন্যূনতম সহানুভূতিও দেখায়নি, উল্টো দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের বর্ষপূর্তিতে ‘শুল্ক-সংঘাত-বিতর্কের’ এক বছর হিসেবে আখ্যায়িত করলে খুব একটা অত্যুক্তি হবে না।
