‘শীতল যুদ্ধ’ বা কোল্ড ওয়্যার যেভাবে গোটা বিশ্বকে দুইভাগ করে ফেলেছিল, ক্রিকেটে ভারতের একক আধিপত্যও ঠিক সেভাবে এই খেলায় অংশ নেওয়া দেশগুলোকেও দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছে। ভারতের সঙ্গে যেসব দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভালো, তাদের ক্রিকেট বোর্ডের আয়-রোজগারও ভালো। যাদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ, সেসব বোর্ডের কোষাগারও প্রায় ফাঁকা। এই ভূরাজনীতির মারপ্যাঁচেই আটকে আছে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা আর না খেলার আশঙ্কা।
আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহর বাবা অমিত শাহ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি মহসিন নাকভিও দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অপারেশন সিঁদুরের পর দুই দেশের সম্পর্ক এমন তিক্ততায় পৌঁছেছে যে মাঠে হাত পর্যন্ত মেলান না ক্রিকেটাররা, পারতপক্ষে দেশটির নাম পর্যন্ত নেন না সংবাদ সম্মেলনে। রাজনীতির এই আঁচ অতীতে ক্রিকেটারদের স্পর্শ করেনি। ইমরান খান আর রবি শাস্ত্রী দিব্যি একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন ইংল্যান্ডে, ইনজামাম উল হক নিজের ছেলেকে শচীন টেন্ডুলকারের সামনে এনে বলেছিলেন, ‘বাচ্চা আমার কিন্তু ফ্যান আপনার।’ জাসপ্রিত বুমরারর সদ্যজাত পুত্রের জন্য উপহার নিয়ে এসেছিলেন শাহিন শাহ আফ্রিদি। কিন্তু এখন হিংসা গ্রাস করেছে দুই তরফেই। ভারত-পাকিস্তানের এই বিবাদ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে বাংলাদেশও। রাজনৈতিক মেরূকরণের ভিত্তিতে কখনো বাংলাদেশ ছিল ভারতের পাশে, কখনো পাশে পেয়েছে পাকিস্তানকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছে। সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে ইনকিলাব মঞ্চ নেতা ওসমান হাদির আততায়ীদের ভারতে পালিয়ে যাওয়ার খবর। অন্যদিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ভারতীয় ডানপন্থি সংগঠনগুলোও ছড়াচ্ছে হিংসা। সব মিলিয়ে উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন তন্দুরের মতোই উত্তপ্ত। এই আগুনেই আলুপোড়া খাবার সুযোগ খুঁজছে কিছু বিশেষ গোষ্ঠী।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, ২১ জানুয়ারির ভেতর বাংলাদেশকে জানিয়ে দিতে হবে যে তারা বিশ্বকাপে খেলতে ভারতে যেতে রাজি কি না। মোস্তাফিজুর রহমানকে হুমকি ও কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বিসিসিআইয়ের নির্দেশে বাদ দেওয়ার পরের যে ঘটনাপ্রবাহ, তাতে শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে ভারতে দল পাঠানোর ব্যাপারে তীব্র অনীহা দেখা গেছে। চিঠি চালাচালি, ভার্চুয়াল বৈঠক কিংবা সামনা-সামনি বৈঠক, কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশ সরকার দ্বিতীয় কোনো অবস্থানে যায়নি। ২১ তারিখে সেই অবস্থান পরিবর্তনেরও কোনো সম্ভাবনা নেই।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান হয়েছে যে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের গ্রুপ বদলের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। ‘বি’ গ্রুপের দলগুলোর সব ম্যাচই শ্রীলঙ্কায়, কারণ এই গ্রুপে আছে সহ-স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা। আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রুপ বদলের একটি সম্ভাবনা জেগেছিল, তবে ক্রিকেট আয়ারল্যান্ডের পক্ষ থেকেও জানান হয়েছে যে, তারা ভারতে গিয়ে ম্যাচ খেলতে রাজি নয়। কেউই সরাসরি কিছু বলছেন না, তবে গুপ্তচরদের কাছ থেকে যুদ্ধবস্থায় পাওয়া খবরের মতো শোনা যাচ্ছে, এই বছর ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে ভারত নাকি আইরিশদের বিপক্ষে দুটো সাদা বলের ম্যাচ খেলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাই আমিনুল ইসলাম বুলবুলের কথায় চিঁড়ে ভিজছে না, কারণ ভারতের দুটো ম্যাচের টিভিস্বত্ব প্রায় ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। একটা টেস্ট দলের ক্রিকেট বোর্ড যারা টাকার অভাবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট আয়োজন করতে পারছে না, এই অর্থটা তাদের কাছে ‘লাইফলাইন’।
পাকিস্তানের কিছু গণমাধ্যমের দাবি, ভারতের এই ট্রাম্পকার্ডের ওপর ওভারট্রাম্প করেছে পাকিস্তান। দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমগুলোতে খবর, পাকিস্তানের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি থামিয়ে দিয়েছেন পিসিবি প্রেসিডেন্ট মহসিন নাকভি। বাংলাদেশের প্রস্তাব না মানলে পাকিস্তানও শ্রীলঙ্কায় খেলতে যাবে না। যদিও এই খবরের পক্ষে কারও কোনো বক্তব্য বা অনুশীলন বন্ধের কোনো নোটিস উপস্থাপন করা হয়নি দেশটির গণমাধ্যমগুলোতে। ২৯ জানুয়ারি থেকে নিজেদের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩ টি-টোয়েন্টির সিরিজ খেলবে পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া। এরই মধ্যে দলও ঘোষণা করে দিয়েছে। বিশ্বকাপে না খেললে এই সিরিজ কি খেলবে পাকিস্তান? এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি আইসিসির এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, বাংলাদেশ যদি ২১ জানুয়ারির ভেতর ভারতে খেলতে আসতে রাজি না হয়, তাহলে বাংলাদেশের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে সুযোগ দেওয়া হবে। কারণ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন না করা দলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ র্যাংকিংস স্কটল্যান্ডের। এই যখন অবস্থা, সোমবার বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন এক মিনিটেরও কম সময়ের সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘গত শনিবার ১৭ জানুয়ারি আইসিসির একজন প্রতিনিধি আসেন এবং তার সঙ্গে আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। সেখানে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জন্য আমাদের যে ভেন্যুর ব্যাপারে ইনফরমেশনটা ছিল, আমরা বলে দিই যে, ঠিক আছে আমরা সেই ভেন্যুতে খেলতে অপারগ এবং অল্টারনেট ভেন্যুর জন্য আমরা রিকোয়েস্ট করি। তাদের প্রতিনিধির সঙ্গে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়। তারা তখন আমাদের বলেন যে, ঠিক আছে, এই ব্যাপারগুলো তারা আইসিসিকে অবহিত করবেন এবং পরে ডিসিশন আমাদের জানিয়ে দেবেন। তো এ ব্যাপারে তারা কোনো স্পেসিফিক ডেট বা কবে নাগাদ জানাবেন কিছুই বলেননি; শুধু বলেছেন যে, আমাদের পরবর্তী তারিখটা কবে হবে তা জানিয়ে দেবেন।’
মোদ্দাকথা, গত বছর দুয়েক ধরে জুলাই অভ্যুত্থান, পেহেলগ্রামে পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, অপারেশন সিঁদুর, দীপু দাস হত্যাকান্ড সব মিলিয়ে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের যে নতুন মেরূকরণ এবং বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে, তারই প্রভাব পড়েছে ক্রিকেটে, যার সহজ একরৈখিক কোনো সমাধান নেই।
