জাতীয় নির্বাচনে এবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ভোট গুরুত্ব দিয়ে কাস্টিং করার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রতিটি সদস্যের ভোট নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলোর সদর দপ্তর থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে প্রতিটি ইউনিটের আবেদনকারীর সংখ্যা ও তাদের নাম-পদবি উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। পুলিশের লক্ষাধিক এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২ লাখ ৭৯ হাজার সদস্য পোস্টাল ভোটের জন্য আবেদন করেছেন।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৫৫ হাজার এবং কারা অধিদপ্তরের ১ হাজার ৮০০ সদস্য পোস্টাল ভোটের জন্য আবেদন করেছেন। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স এবং র্যাবের সদস্যরাও এতে অংশ নিচ্ছেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটারদের উপস্থিতি থাকছে না। এবারের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে সরকার পোস্টাল ভোটে বিশেষ নজর দিয়েছে।
সরকারের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচনী দায়িত্বে ভোট নিশ্চিত করতে বাহিনীর সদর দপ্তরের চিঠি
নিয়োজিত সদস্যরা সাধারণত সবার ভোট নিশ্চিত করেন। কিন্তু নিজেরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকেন; এবার তাদের ভোটের ব্যবস্থা হয়েছে, একই সঙ্গে যেসব সদস্য পোস্টাল ভোট প্রদানে বিরত থাকবেন এবং পোস্টাল ভোট দিতে অন্যদের নিরুৎসাহী করছেন, তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এবার আওয়ামী-দোসর ছাড়া কেউ ভোটাধিকার প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকবেন বলে বিশ^াস করি না।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নির্বিচারে মানুষ খুনের অভিযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের বাইরে রয়েছে আওয়ামী লীগ। দলটির দাবি অনুযায়ী, দেশের বড় একটি অংশ তাদের নেতাকর্মী-সমর্থক। নির্বাচনে তাদের অনেক নেতাকর্মী-সমর্থক ভোটদানে বিরত থাকবেন। আত্মগোপনে থেকে দলটির নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোট প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এসব বিবেচনায় নির্বাচনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোট কাস্টিংয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে সরকার।
দেশে পোস্টাল ভোট চালু হয় ১৯৭২ সালে। তবে এবারই প্রথম আইটি-সাপোর্টেড অনলাইন পোস্টাল ভোটিং প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইসি। এবার প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নিবন্ধিত ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে কোনো খরচ হবে না। তবে ইসি জানিয়েছে, ভোট আয়োজনে প্রতি ভোটারে নির্বাচন কমিশনের খরচ ৭০০ টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বাহিনীতে অনেকে আগ্রহ করে পোস্টাল ভোটের আবেদন করলেও কিছু সদস্য বিরত থাকছে। তবে ইতিবাচক সাড়াই বেশি। সরকারি চাকরি করলেও নিজস্ব অভিমত জানাতে আগ্রহী অনেকেই। বাহিনীও তাদের ভোটপ্রদানে উৎসাহ দিচ্ছে।’
পুুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবে এমন সব সদস্যকে পোস্টাল ভোট দেওয়ার বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সব পুলিশ ইউনিটকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে কত সদস্য পোস্টাল ভোটের জন্য আবেদন করেছেন, তা বলা যাচ্ছে না।’
এবার দেশে নিবন্ধিত ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন প্রবাসী বাংলাদেশি, সরকারি ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা এবং আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তি। এর মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৮১ হাজার ৪৩৫ ও নারী ২ লাখ ৫২ হাজার ২৪৬ জন।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইতিমধ্যে ১০৪টি দেশে ৭ লাখ ২৮ হাজার ২৩টি পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়েছে। প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে গতকাল বুধবার। আজ বৃহস্পতিবার পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপের মাধ্যমে ভোট দেওয়া শুরু হবে; নির্বাচনী প্রচারণাও শুরু হবে।
ইসি পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপ উদ্বোধন করে গত ১৮ নভেম্বর। পরদিন এ অ্যাপের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধন শুরু হয়। গত ৩১ ডিসেম্বর নিবন্ধন শেষ হয়। এ সময়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ জন সরকারি কর্মকর্তা, ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪২ জন নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা, ১০ হাজার ১০ জন আনসার ও ভিডিপির সদস্য পোস্টাল ভোটের আবেদন করেছেন এবং আইনি হেফাজতে থাকা ৬ হাজার ২৮৫ জন নিবন্ধন করেছেন। সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি নিবন্ধন করেছেন ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুখপাত্র উপপরিচালক মো. আশিকউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশে আনসারের ২ লাখ ৭৯ হাজার সদস্য পোস্টাল ভোটের জন্য আবেদন করেছেন। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় ১৩ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে টহলে থাকবেন গার্ড ব্যাটালিয়নের সদস্যরা।’
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘এবার পোস্টাল ভোটের জন্য ৫৫ হাজারের বেশি বিজিবি সদস্য আবেদন করেছেন।’
সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, ‘কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকাংশই নিজ জেলায় চাকরি করেন। অধিদপ্তরের ১১ হাজারের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও পোস্টাল ভোটের জন্য আবেদন কম।’
