১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:২৪ এএম

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামোয় ১০০ শতাংশ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ কতটা যৌক্তিক? এই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কার্যকারিতা কোথায় বেড়েছে? বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কতটা বেড়েছে? সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান প্রয়োজন। সেই সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৭ মাসে  বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ উন্নয়নের সুফল পাওয়ার জন্য কী কাজ করেছে তার একটি ‘রিপোর্ট কার্ড’ প্রয়োজন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে ‘অর্থনৈতিক শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে এসব কথা বলেন নাগরিকরা। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এই নীতি সংলাপের আয়োজন করেছে।

সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল প্রমুখ। এ ছাড়া ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এমএ বাকী খলিলী, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান সরদার এ নাঈম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

নীতি সংলাপে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিপুল হারে বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কতটা বেড়েছে, বেতন বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক তার ব্যাখ্যা কোথায়? রাজধানীর মিন্টো রোডে সচিবদের যে ফ্ল্যাট আছে, সেগুলোর সুযোগ-সুবিধার বিবেচনায় সেগুলো বিলাসবহুল হোটেলকেও হার মানাবে। সরকারের এ ধরনের ব্যয়ের জন্য কে জবাবদিহি করবে, তা আলোচনার মধ্যে নেই। কোনো সরকারের অপচয়মূলক প্রকল্প ও পরিচালন ব্যয় নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয় না।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কয়েকটি গুরুতর অদক্ষতা রয়েছে অর্থায়ন-সংকট, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব ও ক্ষমতাবানদের অহমিকা দেখানোর প্রকল্প। তিনি বলেন, সম্প্রতি বিমানের পরিচালনা পর্ষদে হঠাৎ তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; এর ব্যাখ্যা কী? নিয়োগের যৌক্তিককারণ থাকলে তা প্রকাশ করতে সমস্যা কোথায়? সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এই সরকারের মধ্যেও আছে।’

ক্ষমতাবানদের অহমিকা দেখানোর প্রকল্প প্রসঙ্গে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘অনেক আইসিটি পার্ক এখন কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দিয়ে দারোয়ানদের বেতন চালাতে হচ্ছে। এসব প্রকল্পের মানসিকতা রাষ্ট্রীয় চিন্তার মধ্যে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।’

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘এই সরকার গঠনের সময় অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতি এই দুইটা মূল আলোচ্য বিষয় ছিল। সরকার কি করেছে, কতটুকু করেছে, কেন পারেনি এসব বিষয় নিয়ে একটু সুনির্দিষ্ট তালিকা জাতির সামনে প্রকাশ করবেন। প্রতিটা মন্ত্রণালয় জাতির কাছে রিপোর্ট কার্ড জমা দিয়ে যাবে। এই রিপোর্ট ইতিহাসে ভালো একটি উপাদান হবে।’

সংস্কারের নামে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তাদের এখতিয়ার-বহির্ভূত কিছু কাজ ছাড়া আর কিছুই করেনি বলে মন্তব্য করেছেন ড. আসাদুজ্জামান রিপন। তিনি বলেন, ‘বেতন বাড়বে কি না, এটা এই সরকারের ঠিক করার বিষয় নয়; এটি নির্বাচিত সরকারের কাজ। সংস্কারের দোহাই দিয়ে তারা এমন অনেক কাজ করছে যা তাদের ম্যান্ডেটের বাইরে।’ তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় যেকোনো সরকারই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো স্বৈরাচারী আচরণ করতে পারে।’

সংসদ সদস্যদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘এমপিরা নির্বাচিত হওয়ার পর এমপি হোস্টেলকে নিজেদের পারমানেন্ট বাসা বানিয়ে ফেলেন। সেখানে তারা অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন এবং আত্মীয়স্বজনদের থাকার ব্যবস্থা করেন। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।’

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে সংশয়ের কথা জানিয়ে জিল্লুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন হবে কি না, সে বিষয়েও তার সংশয় আছে। সরকার ইতিহাসের সেরা নির্বাচনের কথা বলছে, কিন্তু বাস্তবে তা ইতিহাসের নিকৃষ্টতম নির্বাচন হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।’

জিল্লুর রহমান বলেন, ‘দেশ এখন নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিন সরকার যেসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেগুলো রুটিন কাজের মধ্যে পড়ে না এসব সিদ্ধান্ত সাধারণত রাজনৈতিক সরকারের নেওয়ার কথা। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা এখনো পরিষ্কার নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর দিকেও তাকালে দেখা যায়, জনগণ কার্যত উপেক্ষিত। অন্যদিকে বর্তমান সরকার এত সংস্কারের কথা বলেছে, এত সংলাপ করেছে, কিন্তু একটি দৃশ্যমান উদাহরণও তৈরি করতে পারেনি। দুর্নীতি দমন কমিশন, মিডিয়া কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হয়নি।’

র‌্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ বলেন, ‘এই সরকার আসার পর অনেকগুলো কমিটি, টাস্কফোর্সসহ অনেক অনেক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। কতটুকু সংস্কার হয়েছে? তিনি দাবি করেন, এই সরকার যে ১৭ মাস ক্ষমতায় ছিল, প্রত্যেকে মন্ত্রণালয় সাধারণ মানুষ উন্নয়নের সুফল পাওয়ার জন্য কী কী কাজ করেছেন তার একটি তালিকা দিয়ে যাবেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত