নেই বিলাসবহুল গাড়ি, নেই দলীয় বহর কিংবা মাইকের শব্দ। ভোরের নরম রোদে বরিশাল শহরের এক প্রান্তে হাঁটা শুরু করেন মনীষা চক্রবর্ত্তী। সঙ্গে কয়েকজন থাকলেও নেই সেøাগান বা শোরগোল। এই নীরবতাই তার রাজনীতির ভাষা।
পেশায় চিকিৎসক মনীষা মানুষের কাছে পরিচিত ‘গরিবের ডাক্তার’ নামে। বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসা দেওয়াই তার পরিচয়ের বড় অংশ। ৩৪তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুযোগ পেয়েও সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি। রাজনীতিকেই বেছে নিয়েছেন পেশা ও দায় হিসেবে। তিনি বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর বরিশাল জেলা কমিটির সমন্বয়ক এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসনে বাসদ মনোনীত, গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত প্রার্থী। মই প্রতীক নিয়ে এবার নির্বাচনে লড়াই করছেন তিনি। হাঁটার সময় একজনের হাতে থাকে একটি ব্যাগ। ভেতরে কিছু লিফলেট। সেগুলো তিনি নিজে এগিয়ে দেন না। কেউ চাইলে দেন, না চাইলে নয়। মনীষার রাজনীতি বক্তৃতা ও পোস্টারনির্ভর নয়।
আন্দোলন-সংগ্রামে তাকে নিয়মিতই দেখা যায় সামনের সারিতে। মাসের বড় একটি সময় তার সকাল শুরু হয় অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে কোনো না কোনো কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে জেলেও যেতে হয়েছে তাকে। তবু রাজপথ ছাড়েননি।
নির্বাচনী প্রচারেও তার কৌশল আলাদা। সকালে টানা কয়েক ঘণ্টা হাঁটেন। দোকানে বসেন, চা খান, মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। ভোট চান না। বরং প্রশ্ন করেন; গত কয়েক বছরে কী বদলেছে, কী বদলায়নি। মানুষের সমস্যা কী, তারা দিন কাটাচ্ছে কীভাবে; সেটাই জানতে চান।
গত শুক্রবার সকালে সরকারি ব্রজমোহন কলেজে পূজা দেখতে যান মনীষা। সেখানে প্রচারণার কোনো আয়োজন না থাকলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কারণ তাদের আন্দোলন-সংগ্রামে মনীষাকে পাশে পেয়েছেন তারা।
এই কথোপকথনের ছবি বা ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয় না। মনীষার মতে, প্রচার যত কম, সম্পর্ক তত গভীর। তিনি বলেন, ‘ভোট চাইতে সবাই আসে। কথা শুনতে আসে কয়জন?’
দুপুরের পর আবার শুরু হয় হাঁটা। পথে পথে ছোট উঠান বৈঠক। বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত। মানুষ যত কম, তিনি তত বেশি শোনেন। ভোটারদের প্রশ্ন করেন, তাদের অভাব-অভিযোগ শোনেন।
নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতির পাহাড় তৈরি হয় বলে মনে করেন মনীষা। তার ভাষায়, ভোটের পর সেই পাহাড়ে আর কেউ ওঠে না। পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোয় প্রার্থীদের দেখা মেলে কেবল নির্বাচন এলেই।
অন্য প্রার্থীরা যখন মিছিল ও শোডাউনে ব্যস্ত, মনীষাদের রাজনীতির কেন্দ্রে থাকে সাধারণ মানুষের সংকট এবং সেই সংকট ঘিরে দীর্ঘদিনের আন্দোলন। প্রচারেও সেই ধারাই বজায় থাকে।
ভোটারদের স্পষ্ট করে বলা হয়; নির্বাচিত হলেও আন্দোলনে থাকবেন, নির্বাচিত না হলেও মানুষের পাশে থাকবেন। কারণ তাদের রাজনীতি মৌসুমি নয়।
দিনের আলো ফুরোলে গ্রামাঞ্চলে ছোট ছোট বৈঠক বসে। বাজারে বা বাড়ির ভেতরে আলো কম, কথা বেশি। এসব বৈঠকেই মনীষা হয়ে ওঠেন আলোচনার অংশ।
বরিশাল জেলা মহিলা পরিষদের সভানেত্রী অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, হেঁটে হেঁটে মানুষের পাশে থাকার এমন রাজনীতি মনীষা ছাড়া আর কারও মধ্যে চোখে পড়ে না। বড় ব্যানার বা জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারে এই জনসম্পৃক্ততার রাজনীতি ধরা পড়ে না। কিন্তু অসংখ্য উঠান বৈঠক ও চায়ের দোকানে তার নীরব উপস্থিতি থেকে যায়। কারণ মনীষা খেটে খাওয়া মানুষের পাশে থাকেন সারা বছর।
