ভারত পেল দুবাই, বাংলাদেশ হলো বাদ: আইসিসির আসল চেহারা উন্মোচিত

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ আইসিসি প্রত্যাখ্যান করার পর, ২০২৬ সালের পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে স্কটল্যান্ড। এই সিদ্ধান্তটি গত বছরের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তানের মাটিতে খেলতে না যাওয়ার ভারতের অনুরোধের সাথে তুলনার জন্ম দিয়েছে—যেখানে ভারতের অনুরোধ রাখা হয়েছিল। উইজডেন ডট কম উভয় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখছে এটি আসলে "দ্বিমুখী নীতি" কি না।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আইসিসি এবং বিসিবির মধ্যে চলা টানাটানি নজর এড়ানো কঠিন ছিল। ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন বিসিসিআই-এর নির্দেশে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) মুস্তাফিজুর রহমানকে তাদের আইপিএল ২০২৬ স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দেয়। "সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ" ছাড়া এর কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। নিলামে ৯.২০ কোটি টাকায় বিক্রি হওয়া মুস্তাফিজের বিদায়কে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতির সাথে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কেকেআর-এর ওপর জনরোষের প্রেক্ষাপটে বিতর্ক এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নিরাপত্তা শঙ্কা প্রকাশ করে ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানায় এবং তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করে। আইসিসি একাধিক বৈঠক ও নিরাপত্তা মূল্যায়নের পর সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে এবং বিসিবিকে অংশগ্রহণের জন্য ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়। শনিবার বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নাম প্রত্যাহার করে নেয়, যা কোনো দলের টুর্নামেন্ট বর্জন করার বিরল এক দৃষ্টান্ত।

এর কয়েক ঘণ্টা পরেই পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি আইসিসির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, "দ্বিমুখী নীতি চলতে পারে না," যেখানে তিনি এক বছর আগে ভারতের একই ধরনের ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।

২০২৫ সালে পাকিস্তানে আয়োজিত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির প্রায় তিন মাস আগে ভারত জানিয়ে দিয়েছিল তারা সেখানে যাবে না এবং নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলার দাবি জানায়। দীর্ঘ দরকষাকষির পর আইসিসি বোর্ড 'হাইব্রিড মডেল' অনুমোদন করে। এই মডেলে পাকিস্তানে আয়োজিত টুর্নামেন্টে ভারত তাদের ম্যাচগুলো দুবাইতে খেলার সুযোগ পায়। বিপরীতে, ভারতে আয়োজিত আইসিসি টুর্নামেন্টে পাকিস্তানও একই সুবিধা পাবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। ভারত তাদের সব ম্যাচ দুবাইতে খেলেছিল, যা সমালোচিত হয়েছিল এই কারণে যে পাকিস্তান ২০২৩ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে আসলেও ভারতকে সেই সুবিধা দিতে হয়নি। ভারতের এই জেদই শেষ পর্যন্ত হাইব্রিড মডেল প্রবর্তনে বাধ্য করে।

এই দুটি ঘটনা আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে 'ন্যায্যতা' কি শর্তসাপেক্ষ? তবে এখানে কিছু পার্থক্য রয়েছে:

 * সময়: ভারত তাদের সিদ্ধান্তের কথা তিন মাস আগে জানিয়েছিল। বাংলাদেশ জানিয়েছে টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র এক মাস আগে, যখন সূচি এবং গ্রুপ চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সময় কি এই বিশাল বৈষম্যকে জায়েজ করে?

 * নিরাপত্তা মূল্যায়ন: বিসিসিআই কখনোই মুস্তাফিজকে ছাড়ার পেছনে নিরাপত্তার কারণ দেখায়নি। বাংলাদেশ এটিকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে যুক্তি দিয়েছিল যে ভারত যদি একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তবে পুরো দলের ক্ষেত্রে কী হবে? কিন্তু আইসিসির নিরাপত্তা মূল্যায়নে ভারতে দলের জন্য কোনো বাড়তি ঝুঁকি পাওয়া যায়নি। ফলে বাংলাদেশের যুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্বল প্রমাণিত হয়।

তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ নতি স্বীকার করেনি। বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দৃঢ়ভাবে বলেন, "দাসত্বের দিন শেষ।" তারা দলের মর্যাদা ও নীতির প্রশ্নে অটল ছিল এবং রাজনৈতিক খেলার ঘুঁটি হতে রাজি হয়নি।

বিপরীতে, ভারত মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে ছিল ক্ষমাহীন। একজন খেলোয়াড়কে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বাদ দিয়ে বিসিসিআই বার্তা দিয়েছিল যে ক্রিকেট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হতে পারে। ভারতের এই ক্রিকেটিয় সিদ্ধান্তের পেছনে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা এবং রাজনৈতিক বার্তার ভূমিকা ছিল স্পষ্ট।

ভারত তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ক্রিকেটের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। বাংলাদেশ তাদের খেলোয়াড়দের মর্যাদা রক্ষায় লড়েছে, যা শেষ পর্যন্ত আইসিসির জন্য 'না' বলা সহজ করে দিয়েছিল। ভারত জানে যে তাদের ছাড়া কোনো আইসিসি ইভেন্ট সম্ভব নয়—তাদের টাকা আছে, সুপারস্টার আছে। তাই পাকিস্তানে না গিয়েও তারা তাদের ইচ্ছামতো দুবাইতে খেলতে পেরেছে। পাকিস্তান হয়তো এই সমঝোতায় রাজি হয়েছিল কারণ লড়াইটা ছিল অসম। এটিই প্রমাণ করে যে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কীভাবে সিদ্ধান্তকে নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সেই শক্তি ছিল না। শেষ পর্যন্ত যে সমস্যার বীজ তিন সপ্তাহ আগে তাদের মাথায় ছিলই না, তার চরম মূল্য দিতে হলো তাদেরই। তারা কেবল নিজেদের আত্মসম্মানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, আর তার পরিণাম হলো টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়া।

গত বছর ভারত পাকিস্তানে যায়নি এবং নিজেদের পছন্দমতো ভেন্যু পেয়েছে। এই বছর বাংলাদেশ ভারতে যেতে চায়নি, কিন্তু তাদের জায়গা অন্য একটি দলকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলাফল একই—উভয় ক্ষেত্রেই কেবল এক পক্ষই জিতেছে। আর একে নিছক কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত