রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এই ব্যয় বৃদ্ধির পুরো অর্থই মিলবে ঋণ থেকে। গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারপারসন মুহাম্মদ ইউনূস। রূপপুরের এ প্রকল্পসহ মোট ২৫ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে একনেক সভায়। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প ১৪টি, সংশোধিত প্রকল্প ছয়টি এবং মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প পাঁচটি। এসব প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি টাকা।
সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় ২৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় অবশিষ্ট স্থাপনা নির্মাণ ও কমিশনিং, খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, নিউক্লিয়ার নিরাপত্তা, ও রুশ জনবলের আবাসন বাড়ানো হবে। ব্যয় বৃদ্ধির পুরো অর্থই মিলবে প্রকল্প ঋণ থেকে। তাতে প্রকল্পের খরচা ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ টাকায়।
বেশি প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে তিনি বলেন, দুটি একনেক সভা হওয়ার পরিবর্তে একটি হয়েছে। তাই প্রকল্প অনুমোদন বেড়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর একনেক করার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, একনেকের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। এর আগেও যখন একবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আমি ছিলাম তখনো নির্বাচনের আগে একনেক সভা হয়েছে। তবে গত তিন নির্বাচনের আগে কী হয়েছিল তা আমার দেখার বিষয় না।
উপদেষ্টা বলেন, সবসময়ই আমাদের প্রকল্পগুলোতে একটা ধীরগতি লেগে থাকে। এবার সব মন্ত্রণালয়ে আমরা সম্মিলিত চিঠি দেব, এ বছরের জুলাই ও ডিসেম্বরের মধ্যে যেসব প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা রয়েছে সেগুলো সম্পন্ন করতে না পারলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে রাশিয়ার সহযোগিতায় বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে পাবনার রূপপুরে। সেখানে দুটি ইউনিটে ১২০০ মেগাওয়াট করে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এই নির্মাণ ব্যয়ের ১০ শতাংশের অর্থায়ন করার কথা ছিল সরকারের, বাকি ৯০ শতাংশ রাশিয়া ঋণ হিসেবে দিচ্ছিল। তবে একনেক সভায় সরকারের অর্থায়নের পরিমাণ ১৬৬ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। তাতে সরকারের অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়াবে ২১ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা; এতদিন যা ছিল ২২ হাজার ৫২ কোটি টাকা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ হবে ৬০ বছর। পরে তা আরও ২০ বছর বাড়ানো যাবে। সংশোধিত অনুমোদনের ফলে এর শেষ হওয়ার সময় ধরা হয়েছে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।
এছাড়া অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ‘রাঙ্গামাটি (মানিকছড়ি)-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-১৬২) প্রশস্তকরণ ও যথাযথমানে উন্নীতকরণ’, একই মন্ত্রণালয়ের ‘মুন্সীগঞ্জ সড়ক বিভাগাধীন ৩টি আঞ্চলিক মহাসড়ক ও ১টি জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’ প্রকল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার থেকে শাহ-আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্প, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদ্যমান রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের শক্তিবৃদ্ধিকরণ (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্প, একই মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রামের পারকিতে পর্যটন সুবিধাদি প্রবর্তন (২য় সংশোধন)’ প্রকল্প, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ‘স্যানিটেশনে নারী উদ্যোক্তা’ প্রকল্প, একই মন্ত্রণালয়ের ‘কুমিল্লা জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্প, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেশের বিভিন্ন স্থানে ফাঁড়ি/তদন্ত কেন্দ্র, ক্যাম্প, নৌ-পুলিশ কেন্দ্র, রেলওয়ে পুলিশ থানা ও আউটপোস্ট, ট্যুরিস্ট পুলিশ সেন্টার এবং হাইওয়ে পুলিশের জন্য থানা/আউটপোস্ট নির্মাণ’ প্রকল্প, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় নির্মাণ (১ম পর্যায়)’ প্রকল্প, বাংলাদেশ রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের ‘দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মায়ানমারের কাছে গুনধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্প, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ‘দেশের ৬৪ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবাদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রকল্প (১ম সংশোধন)’ প্রকল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের ‘সিলেট টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্প, একই মন্ত্রণালয়ের ‘সিলেট টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট স্থাপন (২য় সংশোধিত) প্রকল্প, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘বিদ্যালয় বহির্ভূত শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষার সুযোগ’ প্রকল্প, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব অ্যা ১ হাজার বেড বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ জেনারেল হাসপাটাল টু প্রোভাইড এডভান্সড মেডিকেল সার্ভিসেস টু দ্য পিওপল অব দ্য নর্দার্ন রিজিওন অ্যান্ড নেইবারিং কান্ট্রিস’ প্রকল্প, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘আশুগঞ্জ-পলাশ সবুজ প্রকল্প’, একই মন্ত্রণালয়ের ‘স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট (এসএসিপি) (৩য় সংশোধন)’ প্রকল্প, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার নদীসমূহের টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (১ম অংশ)’ প্রকল্প, একই মন্ত্রণালয়ের ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায় মহানন্দা নদী ড্রেজিং ও রাবার ড্যাম’ প্রকল্প, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পদ্মা নদীর উভয় তীর সংরক্ষণ (১ম অংশ)’ প্রকল্প, ‘তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন থেকে বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা রক্ষাকরণ’ প্রকল্প, ‘শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার পদ্মা নদীর ডান তীরের ভাঙন থেকে মাঝিরঘাট জিরো পয়েন্ট এলাকা রক্ষা (১ম সংশোধন)’ প্রকল্প, ‘আড়িয়াল বিল এলাকার জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে পানি ও ভূমি সম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্প।
একনেক সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন; খাদ্য এবং ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার; স্বরাষ্ট্র এবং কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, পানি সম্পদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান; প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার; বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন; স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম প্রমুখ।
