খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে দেশের করপোরেট খাতকে ব্যাংক থেকে আলাদা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। এ জন্য বন্ড মার্কেটকে (বাজার) গুরুত্ব দিয়ে অর্থনীতিতে এ মার্কেটকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে। করপোরেট অর্থায়নের জন্য প্রথম অবস্থানে নিয়ে আসা হবে। তবে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের উচ্চ সুদ ব্যবস্থা বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা কঠিন। সে জন্য অর্থনীতিকে পুরো মাত্রায় স্থিতিশীলতায় এনে ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে একটি কার্যকর বন্ড মার্কেট গঠন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন গভর্নর।
গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘বন্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রেকমেন্ডেশনস’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘করপোরেট খাত থেকে ব্যাংক আলাদা করে নেওয়া হবে। এ জন্য বড়দের ‘সিঙ্গেল বরোয়ার লিমিট (একক গ্রাহক ঋণ সীমা) অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না।’
জানা গেছে, বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বন্ডের বাজার উন্নয়নে একটি গবেষণা চালিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সেই গবেষণা প্রতিবেদনের আলোকে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা এজাজুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, অর্থ বিভাগের সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান।
কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে একটি কোম্পানি বা গ্রুপ কত ঋণ নিতে পারবে তার একটি সীমা রয়েছে, একে বলা হয় একক গ্রাহক ঋণসীমা। বর্তমানে একক গ্রাহক ঋণসীমা হচ্ছে কোনো ব্যাংকের মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি কাউকে এককভাবে ঋণ দিতে পারবে না ব্যাংক। এর মধ্যে ফান্ডেড ঋণ হবে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ এবং নন-ফান্ডেড হবে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। অবশ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ সবুজ অর্থায়ন খাতে এই সীমা শিথিল করা আছে।
একক ঋণসীমা প্রসঙ্গে আহসান মনসুর বলেন, ‘করপোরেট প্রতিষ্ঠান যেন বন্ড মার্কেটে যায়, সেজন্য তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তাদের আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে। বন্ড ইস্যু করতে সময় কমিয়ে আনা, খরচ কমানোর মতো উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হয়। করপোরেটদের বন্ডমুখী করতে কোনো ধরনের ইনসেনটিভ দেওয়া যায় কি না, বিবেচনা করার সময় হয়েছে। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি ।’
বিশ্বের অর্থনীতিতে বন্ড মার্কেট প্রথম অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনীতিতে প্রথম অবস্থানে থাকে বন্ড মার্কেট, পরে পুঁজিবাজার ও তৃতীয় অবস্থানে থাকে মুদ্রা বাজার বা মানি মার্কেট। বাংলাদেশে এর উল্টো পরিস্থিতি চলছে। এখানে একটি বড় পরিবর্তন আনতে হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীরা মিলে এই পরিবর্তনটা করতে হবে। কারণ সরকারের ঋণ সবচেয়ে বেশি। সেজন্য বন্ড মার্কেটকে উন্নয়ন ও কার্যকর করতে সরকারকে আগে এগিয়ে যেতে হবে।’
এখন বন্ড মার্কেট বড় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ৫-৬ লাখ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্রের বাজার আছে। এটা সহজে সেকেন্ডারি মার্কেটে (পুঁজিবাজারে) আনা যায়। চাইলে সহজেই কেউ বিক্রি করে দিতে পারবে। এটা ট্রেডেবল করা কোনো বিষয় না। এটা করলেই বন্ড মার্কেটের আকার রাতারাতি দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বন্ড মার্কেট বড় করতে হলে বিনিয়োগকারীদের ‘বিশ্বাস’ করাতে হবে যে কোম্পানি যথা সময়ে লাভসহ অর্থ ফেরত দেবে। কোনো কারণে তা দিতে না পারলে কোম্পানিকে খেলাপি হিসেবে ধরা হবে।
গভর্নর বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকঋণের ১৬ শতাংশ সুদহার বন্ড মার্কেটের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করতে হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে। মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকে ১৬ শতাংশ সুদ থাকলে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা কঠিন। সে জন্য অর্থনীতিকে পুরো মাত্রায় স্থিতিশীলতায় এনে ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে একটি কার্যকর বন্ড মার্কেট গঠন করা সম্ভব।
মূল প্রবন্ধে এজাজুল ইসলাম সুপারিশ করেন, সরকারি বন্ড কেনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি ‘ওয়ান স্টপ’ সার্ভিস ডেস্ক খোলা যেতে পারে। এখান থেকে সরাসরি ও অনলাইনের মাধ্যমে যে কেউ যাতে বন্ড কিনতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
সেমিনারে বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, ব্যাংকিং খাত থেকে খুব সহজে যদি করপোরেটরা ঋণ পেয়ে যান, তাহলে তারা পুঁজিবাজারে আসতে চাইবেন না। আর খেলাপি ঋণের আকার বড় হওয়ার কারণ হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংকঋণ। এখানে বড় ধরনের অসংগতি হওয়ার কারণে খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি খারাপ অবস্থায় চলে গেছে।
তিনি বলেন, বন্ড মার্কেটের উন্নয়নে এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে কাজ শুরু হলেও ভবিষ্যতে পুরো নিয়ন্ত্রণ পুঁজিবাজারের অধীনে চলবে। এর মাধ্যমে অর্থনীতিকে ব্যাংক নির্ভরতা থেকে কীভাবে পুঁজিবাজার নির্ভর করা যায় সেদিকে আমরা এগিয়ে যাব।
অর্থ বিভাগের সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ট্রেজারি বন্ড সেকেন্ডারি মার্কেটে আনা হয়েছে। কিন্তু এখানে সমস্যা হচ্ছে প্রতিটি ধাপে সরকারি কর আদায় করা যাচ্ছে না। এটা সফটওয়্যারগত সমস্যা, এর সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি ও অর্থ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। সঞ্চয়পত্র থেকে সিলিং (সীমা) তুলে দেওয়ার চিন্তা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ বিষয়েও কাজ করা হবে বলে জানান তিনি।
সেমিনারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমানের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, বিএসইসি কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক উজমা চৌধুরী এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন।
