দোয়া কবুলে বিলম্বের অন্তর্নিহিত হেকমত

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৪ এএম

মানুষ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে নিজের অসহায়তা তুলে ধরে। অশ্রুসিক্ত চোখে চাওয়ার কথা বলে। কিন্তু অনেক সময় সেই চাওয়ার প্রতিফলন তৎক্ষণাৎ হয় না। অপেক্ষা দীর্ঘ হয়। তখনই মনের ভেতরে সূক্ষ্ম এক টানাপড়েন শুরু হয়। প্রশ্ন জাগে, দোয়া কেন কবুল হচ্ছে না? অথচ দোয়া কবুলে বিলম্ব মানেই প্রত্যাখ্যান নয়। বরং এই বিলম্বের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মহান আল্লাহর বিশেষ দৃষ্টি, বান্দার পরিশুদ্ধির পরিকল্পনা এবং আত্মিক উন্নতির গভীর শিক্ষা। যে দৃষ্টি দিয়ে মানুষ শুধু ফলাফল দেখে, সেই দৃষ্টি ছাড়িয়ে যে মুমিন মহান আল্লাহর হেকমত বুঝতে শেখে, তার কাছে দোয়া আর কেবল চাওয়ার বিষয় থাকে না। দোয়া হয়ে ওঠে বিশ্বাসের অনুশীলন, ধৈর্যের সাধনা এবং রবের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার অবিরাম যাত্রা। এখানে এমন কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো, যা একজন পাঠকের চিন্তাশক্তিকে সুন্দর করবে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’ (সুরা আম্বিয়া ৩৫) কল্যাণ দ্বারা পরীক্ষিত হলে শোকরিয়া জ্ঞাপন করা এবং মসিবত দ্বারা পরীক্ষিত হলে ধৈর্যধারণ করা মমিনের কর্তব্য। সুতরাং বিপদের সময় দীর্ঘ হলে সাবধান থাকা এবং বেশি পরিমাণে দোয়া করা উচিত।

দোয়াকারীর ভুলের কারণে কখনো দোয়া কবুল হয় না। দোয়ার সময় সে হারাম বা সন্দেহপূর্ণ খাবার খেত অথবা দোয়ার সময় তার অন্তর অমনোযোগী ছিল। কিংবা সে নিষিদ্ধ পাপাচারে জড়িত ছিল। ফলে দোয়া কবুল হতে দেরি হলে নিজের মধ্যে অনুসন্ধান করতে হবে, কেন দোয়া কবুল হচ্ছে না? সে জন্য লক্ষ রাখতে হবে আল্লাহর সঙ্গে তার অবস্থা কী?

কোনো ব্যক্তি যদি তাকওয়া অবলম্বন করে তাহলে সে তার চাওয়া অনুযায়ী প্রাপ্ত হবে। একমাত্র পাপই তার দোয়া কবুলের পথে অন্তরায়। জেনে রাখা আবশ্যক যে, তাকওয়া প্রশান্তির কারণ, যা সব কল্যাণ উন্মুক্ত করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বস্তুত যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উপায় বের করে দেন। আর তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে রিজিক প্রদান করে থাকেন।’ (সুরা তালাক ২-৩)

মহান আল্লাহ কাউকে কিছু দিলে সেটা যেমন হেকমতপূর্ণ আর কাউকে বঞ্চিত রাখলে তাও হেকমতপূর্ণ। সুতরাং অদৃশ্য হেকমতের অপেক্ষায় আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। কেননা মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই তোমরা এমন বহু কিছু অপছন্দ করো, যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর অবশ্যই এমন বহু কিছু পছন্দ করো, যা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। আল্লাহই সবকিছু জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা ২১৬)

নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রেষ্ঠ বিচারক ও পরম দয়ালু। বান্দার জন্য কোনটা কল্যাণকর তিনিই অধিক জ্ঞাত। আর তিনি অধিক দয়াশীল তার স্বীয় ব্যক্তিজীবনের চেয়ে, এমনকি তার পিতা-মাতার চেয়েও। যখন তার ওপর এমন কিছু নাজিল হয়, যা সে অপছন্দ করে সেটাই তার জন্য কল্যাণকর। এটা আল্লাহ করে থাকেন বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে এবং তাদের ওপর দয়াস্বরূপ। সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলেন, তাকে না দেওয়াটাও একটা দান। এটা এ জন্য যে, তিনি তাকে কৃপণতা ও অন্য খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখেন। মূলত তিনি বান্দার কল্যাণের দিকে লক্ষ রাখেন। অতঃপর তাকে না দেওয়াটাও কল্যাণকর বিষয়। (মাদারিজুস সালিকিন ২/২১৫)

মানুষ তার কাজের ফলাফল সম্পর্কে অজ্ঞাত। মানুষ এমন কিছু চায়, যা তার উপযোগী নয়, বরং তার জন্য ক্ষতিকর। এর উদাহরণ ওই উত্তেজিত শিশুর ন্যায়, যে মিষ্টান্ন চায় অথচ সেটা তার জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং মানুষের জন্য কোনটা কল্যাণকর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা এমন বহু কিছু অপছন্দ করো, যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।’ (সুরা বাকারা ২১৬)

মহান আল্লাহ চান তার বান্দারা মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত পূর্ণ করুক। তিনি তাদের বিভিন্ন রকম মসিবত দ্বারা পরীক্ষা করেন। কখনো দেরিতে দোয়া কবুলের মাধ্যমেও। যাতে তার বান্দারা দোয়া নামক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের পূর্ণতার উচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারে। কেননা যথাযোগ্য ইবাদতেই বান্দার মর্যাদা পূর্ণ হয়। সুতরাং যখন একজন বান্দা যথাযোগ্য ইবাদত বৃদ্ধি করে তখন তার পূর্ণতাও বৃদ্ধি হয়। সঙ্গে সঙ্গে তার মর্যাদাও বেশি হয়। (উবুদিয়াত লি ইবনে তাইমিয়াহ ৮০)

মহান আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের দুনিয়ায় কষ্টের সম্মুখীন করে থাকেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন তার কোনো বান্দার মঙ্গল সাধনের ইচ্ছা করেন তখন দুনিয়ায় তাকে অতি তাড়াতাড়ি বিপদাপদের সম্মুখীন করেন। আর যখন তিনি কোনো বান্দার অকল্যাণের ইচ্ছা করেন তখন তার গুনাহের শাস্তি প্রদান থেকে বিরত থাকেন। অবশেষে কেয়ামতের দিন তাকে এর পরিপূর্ণ শাস্তি প্রদান করেন। আর আল্লাহ যখন কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন তখন তাদের তিনি পরীক্ষায় ফেলেন। যে তাতে সন্তুষ্ট থাকে তার জন্য (আল্লাহর) সন্তুষ্টি থাকে। আর যে তাতে অসন্তুষ্ট হয় তার জন্য (আল্লাহর) অসন্তুষ্টি থাকে।’ (তিরমিজি ২৩৯৬)

দোয়া করে কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না, বরং দোয়া কবুল হোক বা না হোক, আল্লাহর কাছে দোয়া অব্যাহত রাখতে হবে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস স্মরণ রাখতে হবে। যেখানে তিনি বলেছেন, কোনো মুসলিম দোয়া করার সময় কোনো গুনাহের অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের দোয়া না করলে অবশ্যই আল্লাহ তাকে এ তিনটির একটি দান করেন। হয়তো তাকে তার কাক্সিক্ষত বস্তু দুনিয়ায় দান করেন, অথবা তা তার পরকালের জন্য জমা রাখেন কিংবা তার কোনো অকল্যাণ বা বিপদাপদকে তার থেকে দূর করে দেন। (মুসনাদ আহমাদ)

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত