দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধা, বিরক্তি ও টেনশনের মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। এসব বিরক্তির সূচনা হয় একেবারে বাসাবাড়ি থেকে বের হতেই। ধরুন সকালে বের হয়ে ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়লেন, কেউ ৫ মিনিটের কথা বলে ৩০ মিনিট অপেক্ষায় রাখল, অফিসে হঠাৎ সহকর্মী খারাপ ব্যবহার করে বসল, বাড়িতে ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া হলো, দোকানে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো দীর্ঘ সময়। খালি চোখে এসব সামান্য বিষয় মনে হলেও এর মাধ্যমে আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা চলে।
এই ছোট অসুবিধাগুলোতে অস্থির হয়ে রেগে গেলে বড় বিপদে ধৈর্যধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। ইসলাম এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকেই ধৈর্য ও সংযমের সর্বোত্তম অনুশীলনের সুযোগ হিসেবে দেখে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৩)
এই আয়াতের ব্যাপকতা আমাদের শিক্ষা দেয়, বড় ধরনের বিপদাপদ ছাড়াও দৈনন্দিন ছোটখাটো বিপদ ও অসুবিধায় ধৈর্যধারণ করতে হয়। মহান আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন।
হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে মুমিন ব্যক্তি মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে এবং তাদের জ¦ালাতনে ধৈর্যধারণ করে সে এমন মুমিন ব্যক্তির তুলনায় অধিক সওয়াবের অধিকারী হয়, যে জনগণের সঙ্গে মেলামেশা করে না এবং তাদের জ্বালাতনে ধৈর্যধারণ করে না। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
এই হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দৈনন্দিন জীবনে মানুষের খারাপ ব্যবহার, অসুবিধা বা বিরক্তি সহ্য করাই সবচেয়ে বড় প্রতিদানের কারণ।
আরও একটি মূল্যবান হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে কষ্ট-ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফুটে, এসবের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। (সহিহ বুখারি)
এখানে কাঁটার কথা বলা হয়েছে। যা সবচেয়ে ছোট কষ্ট বা অসুবিধা, তাও গুনাহ মাফের কারণ হয়, যদি ধৈর্যধারণ করা হয়। এতে আমাদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, দৈনন্দিন জীবনে সামান্য ঝামেলাগুলোই আসলে মহান আল্লাহর কাছে বড় মর্যাদা ও প্রতিদানের সুযোগ তৈরি করে।
আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল নবীজি (সা.)-এর পথে আবর্জনা ফেলে রাখত তাকে বিরক্ত করার জন্য। নবীজি (সা.) কখনো রাগ করেননি, অভিযোগ করেননি বা প্রতিশোধ নেননি। (তাফসিরে তাবারি, সুরা লাহাব)
সামান্য অসুবিধায় ধৈর্যের জন্য ব্যবহারিক পদ্ধতি শিখিয়েছে ইসলাম। যেমন রাগের সময় চুপ থাকা। নবীজি (সা.) বলেন, রাগ হলে চুপ করে থাকো। (মুসনাদে আহমদ)
এ ছাড়া রাগ উঠলে ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়া। অজু করে নেওয়া। কারণ রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে এবং শয়তান আগুন থেকে সৃষ্ট। ছোটখাটো অসুবিধায় ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলে আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া। এসব আমল দৈনন্দিন জীবনকে শান্তিময় করে তোলে এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য বাড়ায়।
আমরা যখন ট্রাফিক জ্যামে ধৈর্যধারণ করি, কারও খারাপ কথায় সংযম অবলম্বন করি, অপেক্ষায় অস্থিরতা প্রকাশ না করি, তখন মহান আল্লাহ আমাদের গুনাহ মাফ করেন, প্রতিদান দেন এবং হৃদয়কে প্রশান্তি করেন। এটি আমাদের চরিত্রকে মজবুত করে, সম্পর্ককে সুন্দর করে এবং জীবনকে সহজ করে।
ব্যস্ততা ও উত্তেজনাপূর্ণ ছোট ছোট অসুবিধা আমাদের ইমানের প্রকৃত পরীক্ষা। ইসলাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সত্যিকারের ধৈর্য ও সংযম এই ছোট মুহূর্তগুলোতেই প্রকাশ পায়। যদি আমরা এতে অটল থাকি, মহান আল্লাহ আমাদের সঙ্গে থাকবেন এবং অপরিসীম প্রতিদান দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। মহান আল্লাহ যেকোনো সমস্যায় আমাদেরকে যথাযথভাবে ধৈর্যধারণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক ও সাংবাদিক
