বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) আইডি হ্যাকের ঘটনায় রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের আইসিটি শাখার সহকারী প্রোগ্রামার ছরওয়ারে আলমকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের পূর্ব পাশের সরকারি কোয়ার্টার থেকে তাকে আটক করা হয়। ওই ঘটনায় ডিএমপির পল্টন থানায় একটি মামলা করেছে জামায়াতের সাইবার ইউনিট। অন্যদিকে, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ‘এক্স আইডিও’ হ্যাক করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী গণমাধ্যমকে বলেন, বঙ্গভবনের কর্মকর্তা ছরওয়ারে আলমকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। অভিযানের সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের আইটি সেলের চার-পাঁচজন সদস্যর একটি হ্যাকার গ্রুপের সঙ্গে তার যোগসূত্র পাওয়া গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি এবং নির্বাচন ভ-ুল করার চক্রান্ত হিসেবেই এই সাইবার নাশকতা চালানো হয়েছে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে ম্যালওয়্যারটির উৎস পার্শ্ববর্তী দেশে তৈরি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র বলছে, বুধবার দিনভর ডিবি কার্যালয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেন সিনিয়র কর্মকর্তারা। এ সময় ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টরা ওই বৈঠকে জানান গ্রেপ্তারের মতোন এভিডেন্স তাদের হাতে নেই। একজন যুগ্ম কমিশনারের সঙ্গে ডিবিপ্রধানের বাগবিতণ্ডাও হয়। এ ঘটনার পর কার্যত ডিবি বিভক্ত হয়ে গেছে।
নাম প্রকাশ না করে ডিবির এক ঊর্ধŸতন কর্মকর্তা বলেন, ৫ আগস্টের আগে পুলিশ যে ধরনের ভুল-ত্রুটি করেছে সেই ধরনের কর্মকা-ে আর জড়াতে চায় না বর্তমানে ডিবির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা।
তিনি আরও বলেন, কোনো সংস্থা থেকে তথ্য পাওয়া গেলে তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে তা যাচাই-বাছাই করে কোনো সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে অন্য কোনো সংস্থার নির্দেশে গ্রেপ্তার কার্যক্রম পেশাদারিত্বের বহির্ভূত একটা কাজ। এজন্য আমরা গ্রেপ্তারে অপারগতা প্রকাশ করেছি।
ঘটনার সূত্রপাত : গত ৩১ জানুয়ারি বিকেলে ডা. শফিকুর রহমানের ‘এক্স হ্যান্ডেল’ থেকে ইংরেজিতে একটি পোস্ট দেওয়া হয়, যেখানে নারীদের কর্মজীবন ও আধুনিক জীবনধারা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ছিল। পোস্টটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। বিএনপিপন্থি অ্যাকটিভিস্ট, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনসহ অন্যরা অভিযোগ করেন, এতে কর্মজীবী নারীদের চরমভাবে অবমাননা করা হয়েছে। ছাত্রদল এ মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে রাজপথে বিক্ষোভ শুরু করে। বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শ ও নারী অধিকার নিয়ে কড়া সমালোচনা করা হয়। তবে জামায়াত তাৎক্ষণিকভাবে দাবি করে, তাদের আমিরের অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়েছে। পোস্টটি তাদের আমিরের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি বরং সাইবার হামলার মাধ্যমে এটি প্রকাশ করা হয়। পোস্টটি যখন দেওয়া হয়, তখন ডা. শফিকুর রহমান কেরানীগঞ্জে একটি নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন, যার লাইভ ভিডিও প্রমাণ হিসেবে রয়েছে। শুধু আমির নন, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন নেতাদের কাছেও একই ধরনের ‘ফিশিং মেইল’ (প্রতারণামূলক বার্তা) পাঠিয়ে তাদের ডিভাইসেও একইভাবে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালানো হয়েছে।
ডিবির তদন্ত ও সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান : ডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আইটি এক্সপার্ট ও ডিবির সাইবার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি যৌথ টিম কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে এটি একটি সংঘবদ্ধ হ্যাকার চক্রের কাজ বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট টার্গেট করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, চক্রের উদ্দেশ্য নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করা এবং সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করা। আটক ব্যক্তির জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে হ্যাকার চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে সরকারি ইমেইল সার্ভার ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা যাচাই করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করে ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দিনভর ছরওয়ারে আলমকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয় অস্বীকার করছেন। তবে তার ডিভাইস পর্যালোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে সিআইডির ফরেনসিক টিমের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
বঙ্গভবনের সংযোগ : গত শনিবার রাতেই জামায়াতের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, সাইবার হামলার মাধ্যমে জামায়াত আমিরের নামে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। শুধু আমির নন, দলের আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টও একই ধরনের হামলার শিকার হয়েছে। গত রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম তথ্যচিত্র তুলে ধরে বলেন, শনিবার বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে জামায়াত আমিরের ‘এক্স অ্যাকাউন্ট’ থেকে নারীদের সম্পর্কে আপত্তিকর পোস্ট দেয় হ্যাকাররা। ওই সময়ে জামায়াত আমির কেরানীগঞ্জের কোনাখোলা মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন। এর লাইভ ভিডিও রয়েছে। ফলে জামায়াত আমিরের পক্ষে পোস্ট করা সম্ভব ছিল না। পোস্টের বিষয়টি ৪টা ৫৩ মিনিটে নজরে আসে জামায়াতের তথ্যপ্রযুক্তি টিমের। বিকেল ৫টা ৯ মিনিটে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদল করা হয়। ৫টা ২২ মিনিটে এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকের বিষয়টি জানানো হয়। ভারতের তৈরি ম্যালওয়্যার দিয়ে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টায় রাজধানীর মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন তিনি। আমিরের পেজ হ্যাক হওয়ার বিষয়টি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারির একটি হ্যাক হওয়া ফেসবুক পেজ থেকেও শেয়ার করা হয়। বিষয়টি শনাক্ত করার পর অ্যাকাউন্টগুলো দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তিনি আরও বলেন, ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার রাতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও একটি অনাকাক্সিক্ষত পোস্ট দেওয়া হয়, যা কিছু সময়ের মধ্যেই মুছে ফেলা হয়।
ডিভাইস কীভাবে হ্যাক হলো এমন প্রশ্নে মাহমুদুল আলম তথ্যচিত্র তুলে ধরে দেখান, গত ১০ জানুয়ারি বঙ্গভবনের ব্যবহৃত সরকারি ইমেইল ঠিকানা থেকে জামায়াত আমিরের ই-মেইল একটি মেইল আসে। এতে লেখা ছিল ‘নির্বাচনসংক্রান্ত জরুরি তথ্য’। সরকারি ইমেইল হওয়ায় জামায়াত আমিরের একটি ডিভাইস থেকে মেইলের অ্যাটাচমেন্ট খোলা হয়। এই ‘ফিশিং অ্যাটাচমেন্ট’ ক্লিকের কারণে ওই ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের কাছে চলে যায়। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ জামায়াতের কাছেও একই ইমেইল ঠিকানা থেকে মেইল যায়। অন্য সিনিয়র নেতাদের কাছেও ফিশিং মেইল পাঠানো হয়। প্রেরকের ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয় বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমের ইমেইল ঠিকানা। এই ইমেইল ব্যবহার করে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট গত ১২ জানুয়ারি হ্যাক করার চেষ্টা করা হয়।
ফিশিং ম্যালওয়্যার সম্পর্কে জামায়াত নেতা সিরাজুল ইসলাম বলেন, যে ম্যালওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি বিশ্লেষণ করে আমরা পেয়েছি এ ম্যালওয়্যার তৈরি হয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশে। অর্থাৎ তারা এ ম্যালওয়্যারটি ইন্ট্রোডিউস করেছে এবং পরবর্তীতে সময়ে এটি আমাদের দেশে এসেছে। এ সময় জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ওলিউল্লাহ নোমান ও ব্যারিস্টার সাইফুদ্দিন খালেদ উপস্থিত ছিলেন।
বঙ্গভবনের কর্মকর্তা আটকের পর আমিরের প্রতিক্রিয়া : গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমার ভেরিফায়েড এক্স আইডি (টুইটার), যেখান থেকে হ্যাক হয়েছিল, সেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন। আশা করি, এখন ন্যায়বিচারটাও পাব এবং তা খুবই প্রয়োজন।’ তিনি আরও লেখেন, ‘দেশে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু করার পক্ষে এ ধরনের আইনি উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। শাস্তি নিশ্চিত হলে অনেকেই সাবধান হয়ে যাবে। আশা করি, এখান থেকে অনেকেরই শিক্ষা হবে। অপেক্ষায় রইলাম, আইনের বাস্তব প্রয়োগ দেখার জন্য।’
এজাহারে যা আছে : গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে জামায়াতের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সমন্বয়ক সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে ডিএমপির হাতিরঝিল থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে একটি মামলা করেছে। ওই মামলায় বঙ্গভবন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমসহ অজ্ঞাতনামা ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের আইডি হ্যাকের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে আইটি টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায় হ্যাকড হয়েছে। আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলসহ দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে গত কয়েক দিন ধরে সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ৩১ জানুয়ারি ডিজিটাল ডিভাইসে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের অফিশিয়াল এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে। সেখানে অনাকাক্সিক্ষত পোস্ট করে যাহা নারীর প্রতি বিদ্বেষ, অশ্লীলতা, জাতিগত সহিংসতা, ঘৃণা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছড়ায়। ওই ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় একটি জিডি করা হয়।
