জনসভায় শফিকুর রহমান

তিস্তা মহাপরিকল্পনা যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করব

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৯ এএম

যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, তিস্তা এ অঞ্চলের মানুষের অহংকার, এখন তিস্তার নাম এক সাগর দুঃখ। আমরা কথা দিচ্ছি, যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। গতকাল বুধবার দুপুরে নীলফামারী ও লালমনিরহাটের যৌথ আয়োজনে তিস্তা ব্যারাজের হেলিপ্যাড মাঠে এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি এসব মন্তব্য করেন।

এদিন তিনি কুড়িগ্রাম ও টাঙ্গাইলের পৃথক দুটি নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেন। এ ছাড়া আগের দিন গত মঙ্গলবার গাজীপুরেও নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। নীলফামারী ও লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল তিস্তা ব্যারাজের হেলিপ্যাড মাঠে ডা. শফিকুর রহমান দীর্ঘ বক্তৃতা দেন।

তিনি বলেন, যারা জাতির সঙ্গে দীর্ঘ সময় বেইমানি করেছে, আগামীর নির্বাচন তাদের লাল কার্ড দেখানোর নির্বাচন। রাজনীতির নামে ব্যবসা নয়, চাঁদাবাজি নয়; এটি হচ্ছে রাজার নীতি। আগামী ১৩ তারিখ বাংলাদেশের পূর্ব আকাশে একটি নতুন সূর্যের উদয় হোক। আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। জামায়াত আমির বলেন, ‘তিস্তা নদীর পানি সারা উত্তরবঙ্গকে উর্বর করে তুলবে। আর নদীভাঙনের কবলে হাজার হাজার পরিবারকে নিঃস্ব হতে হবে না। তিস্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। কারণ, আমার দেশ আগে, এ দেশের জনগণের স্বার্থ আগে। আমরা কারও স্বার্থে আঘাত দেব না, কিন্তু কেউ যদি আগে আমাদের স্বার্থে আঘাত করে, সেটা মেনে নেব না। এখন অনেক যৌক্তিক দাবি রয়েছে, তার মধ্যে বুড়িমারী স্থলবন্দর আধুনিকায়ন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘তিস্তাপাড় থেকে বাংলাদেশের উন্নয়ন শুরু হবে ইনশাআল্লাহ। যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অনেকে বসন্তের কোকিলের মতো একবার দেখা দেয়। আমরা বসন্তের কোকিল নই, দুঃখের সময়েও আছি, ভালো সময়েও আছি। আমরা বিপদের সময়ে দেশ ছেড়ে চলে যাই না, মাটি কামড়ে ধরে থাকি। আমরা দেশবাসীর বুকে আশ্রয় চাই।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখন ক্ষমতা পালাবদলের সময় এসেছে। আপনারা বিশ্রামে যান, আমাদের সুযোগ দেন। আমরা কখনো দেশের মানুষকে ছেড়ে যাব না। আমরা ঘোষণা দিয়েছি, উত্তরবঙ্গকে দেশের কৃষিভিত্তিক রাজধানী গড়ে তুলব। যখন কর্মসংস্থান হবে, তখন সারা দেশ উন্নত হবে। এ অঞ্চলের উৎপাদিত শস্য শুধু দেশের চাহিদা মেটাবে না, বিদেশে রপ্তানি করাও যাবে। আল্লাহ যদি আমাদের এ দেশ নেওয়ার সুযোগ দেন। আমি যদি আপনাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারি, দেশে যারা আছে সবাইকে নিয়ে আমরা বাংলাদেশ গড়তে চাই। সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব।’

তিনি নারীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘বর্তমানে মা-বোনেরা লাঞ্ছিত হচ্ছে। আমরা বলে রাখি, প্রয়োজনে জীবন দেব; তবুও মা-বোনের ইজ্জত কাউকে কেড়ে নিতে দেব না। এ দেশের ৯ কোটি নারী আমাদের মা। তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে আমরা দেখি। তারা শিক্ষিত হবেন, দেশ গড়তে দায়িত্ব নেবেন। তারা কর্মস্থানে কাজ করবেন ইনশাআল্লাহ। তারা সব জায়গায় থাকবেন, নিরাপদভাবে মর্যাদার সঙ্গে কাজ করবেন। আমরা নারী জাতির জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ।’

এ সময় লালমনিরহাট জেলা আমির অ্যাডভোকেট আবু তাহেরের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় ও জেলা-উপজেলার বিভিন্ন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্য শেষে জামায়াত আমির নীলফামারীর চারটি আসন ও লালমনিরহাটের তিনটি আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।

এদিকে কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, গতকাল দুপুরে কুড়িগ্রাম কলেজ মাঠে জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। সেখানে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী এ যুগে সবচেয়ে বড় দল। কিন্তু আমরা কোনো দলীয় সরকার কায়েম করতে চাই না। আমরা কোনো পরিবারতন্ত্র বা গোষ্ঠীতন্ত্র কায়েম করতে চাই না। আমরা বাংলাদেশ ইসলামীর বিজয়ও চাই না। আমরা চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়।

তিনি বলেন, তিস্তাপাড় থেকে এ বিজয় শুরু হয়েছে। সারা বাংলায় এখন মুক্তির গণজোয়ার শুরু হয়েছে। এতে দেশের মায়েরাই আমাদের শক্তি জুগিয়েছেন। আমরা মায়েদের কথা দিচ্ছি, আমাদের সবকিছুর বিনিময়ে আপনাদের চলাচলে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। মা-বোনদের সম্মান করা আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

জামায়াত আমির বলেন, চার দিন আগে আমার এক্স আইডি হ্যাক করে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে। আর একটি দল তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। লজ্জা, ওদের চুনোপুঁটিসহ বড় বড় নেতাও গান গাইতে শুরু করেছে। আমাদের সাইবার টিম তাদের শক্তভাবে ধরে ফেলেছে। অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সত্য চাপা থাকে না।

তিনি বলেন, আমাদের নদীগুলোকে হত্যা করা হয়েছে। সবাই চোর। নদীভাঙন রোধের জন্য যত বাজেট হয়েছে, সব তাদের পেটে গেছে। এ চোরেরা টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করেছে ২৮ লাখ কোটি টাকা। আমরা যদি সুযোগ পাই, তাহলে ওদের বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে সব বের করে আনব। ক্ষমতায় গেলে দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জেলা কুড়িগ্রাম থেকে উন্নয়ন শুরু হবে।

এদিকে গতকাল বিকেলে টাঙ্গাইল শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, আগামী ১২ তারিখ জাতীয় নির্বাচন। এবার ১ হাজার ৪৫০ শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এই নির্বাচন। এই নির্বাচন আন্দোলনে পঙ্গুত্ব বরণ করা ৩৪ হাজার আহতের নির্বাচন। এই নির্বাচন শহীদ পরিবারের হাহাকারের নির্বাচন। অতএব এই দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচন করতে হবে। এই নির্বাচনে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ আমাদের হাতে এসেছে।

গণভোট সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্বাচনে দুটি ভোট। প্রথম ভোট ‘হ্যাঁ’র পক্ষে ইনশাআল্লাহ। ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে বাংলাদেশ জিতবে। ‘না’ ভোট জিতলে বাংলাদেশ পরাজিত হবে। ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামি। অনেকে ইতিপূর্বে ‘হ্যাঁ’ও বলেনি, ‘না’ও বলেনি। এখন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বলছেন অভিনন্দন, মোবারকবাদ। ‘হ্যাঁ’ ভোটের সঙ্গে যারা থাকবে, তারা প্রমাণ করবে যে, তারা চাঁদাবাজের সঙ্গে নেই, দুর্নীতির সঙ্গে নেই, মামলাবাজের সঙ্গে নেই, মা-বোনদের অপমানের সঙ্গে নেই। তারা আছে নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে, তারা আছে ২৪-এর আকাক্সক্ষার সঙ্গে। আমরা সেই আকাক্সক্ষাকে সম্মান করে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেব ইনশাআল্লাহ। দ্বিতীয় ভোটটা দেশ গড়ার ভোট। আগামীতে যারা সরকার চালাবে, তারা যারা অতীতে ভালো মানুষ প্রমাণিত হয়েছে। বারবার সুযোগ পেয়েও যারা দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়েছে, তাদের নতুন করে দেখার কিছু নেই। এমনকি এখনো যারা দুর্নীতিতে লিপ্ত, তাদের আর নতুন করে দেখার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমরা ১১টি দল একত্রিত হয়েছি। আমরা প্রত্যেক দল নিজেদের সম্মান-মর্যাদা অক্ষুণœ রেখে নিজ দলের পক্ষে খেটে ইনশাআল্লাহ বিজয় আনব। অতীতে ৫৪ বছরে অনেক নির্বাচন হয়েছে, সরকারও গঠিত হয়েছে। ভোটের আগে অনেক ওয়াদা করেছে, কিন্তু ভোটের পর ওয়াদা ওয়াদাই থেকে গেছে। যার কারণে সমাজে বৈষম্য দেখা দিয়েছে, অপরাধ চরমে পৌঁছেছে, দুর্নীতি গোটা সমাজকে ডুবিয়ে দিয়েছে এর বিরুদ্ধে আমাদের যুবসমাজ ফুঁসে উঠেছে। তারা বলেছে, আমরা ন্যায়বিচার চাই, বাঁচার অধিকার চাই, শিশুর জন্য শিক্ষা চাই, যুবক-যুবতীর জন্য কাজ চাই, মা-বোনদের জন্য নিরাপত্তা চাই, ব্যবসায়ীদের জন্য শান্তিতে ব্যবসা করার অধিকার চাই, শ্রমিকের জন্য ন্যায্য মজুরি চাই, কৃষকের জন্য জমিতে ফসল ফলানোর নিরাপদ ও উন্নত সরঞ্জাম চাই। এসব চাওয়া কি তাদের অপরাধ ছিল?

এ সময় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জেলার আটটি আসনের দলীয় ও শরিক দলের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা ও শাপলা কলি প্রতীক তুলে দেন। টাঙ্গাইল জেলা জামায়াতের আমির আহসান হাবিব মাসুদের সভাপতিত্বে ওই নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতে ইসলামী ও শরিক দলের নেতা ও প্রার্থীরা বক্তব্য রাখেন।

আর আগের দিন গত মঙ্গলবার বিকেলে গাজীপুরের ঐতিহাসিক রাজবাড়ী মাঠে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা রাজনীতিতে রাজার ছেলে রাজা হবে এ ধারা পাল্টে দেব ইনশাআল্লাহ। একজন শ্রমিক ভাই কিংবা বোনের সন্তান মেধাবী হলে তার মেধা বিকাশের দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্র। আমরা চাই, তাদের মধ্য থেকে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী বের হয়ে আসুক।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘গাজীপুর একটি শিল্প এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এর রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ সিস্টেম, সুপেয় পানির সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ সবকিছুতেই সমস্যা আছে। অথচ এই গাজীপুর বাংলাদেশের জিডিপিতে বিশাল অবদান রাখছে। যার যেমন পাওনা, তাকে তেমন মূল্যায়ন করাই ইনসাফ। আমরা চাই না কেউ বেকার ভাতা নিয়ে অপমানিত হোক। বরং আমরা যুবসমাজকে সুশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সক্ষম করে তুলব এবং দেশের নেতৃত্বের ককপিটে বসিয়ে দেব।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘একদল লোক আছে যারা জনগণের উত্থান দেখে দিশেহারা হয়ে মায়েদের গায়েও হাত দিচ্ছে। সাবধান করছি, কোনো মায়ের গায়ে হাত দেব না। যারা মায়েদের সম্মান করতে পারে না, আল্লাহ তাদের অপদস্থ করুন। আমরা জীবনের বিনিময়ে হলেও মায়েদের সম্মান রক্ষা করব।’

তিনি বলেন, ‘সব মালিকের দৃষ্টিভঙ্গি সমান নয়, অনেকে সম্মানের সঙ্গে শ্রমিকদের রেখেছেন। তবে এ সংখ্যাটা অনেক কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সম্মান দেওয়া হয় না। বিশেষ করে মায়েদের সম্মান দেওয়া হয় না এবং সেখানে বেতনবৈষম্য আছে। পুরুষের এক ধরনের, নারীদের আরেক ধরনের যদিও কাজ সমান। আমরা এসব বৈষম্য দূর করে ফেলব ইনশাআল্লাহ।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত