চুক্তির প্যাঁচে অচল চট্টগ্রাম বন্দর

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৪ এএম

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দরকষাকষিতে আটকে গেছে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা চুক্তি। শ্রমিক-কর্মচারীদের চলমান আন্দোলনসহ চারটি পয়েন্ট নিয়ে চলছে এ দরকষাকষি। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অথরিটি ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এমনটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে অচল হয়ে আছে দেশের আমদানি-রপ্তানির গেটওয়ে চট্টগ্রাম বন্দর। অন্যদিকে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন আজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে আসছেন এবং বন্দর ভবনে জরুরি সভা ডেকেছেন। ধারণা করা যাচ্ছে, সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সেই সভা থেকে এনসিটি নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থার সুরাহা হতে পারে।

এ চুক্তিকে কোনোভাবেই মেনে নেবেন না চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। আর এ কারণে ২০০৬ সালের পর এই প্রথমবারের মতো বন্ধ হলো চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম। গত শনি থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি থাকলেও গতকাল বুধবার থেকে শুরু হয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি। এতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কোনো জাহাজ যেমন ছেড়ে যেতে পারছে না, তেমনি বন্দরের জেটিতে কোনো জাহাজও ভিড়তে পারছে না। আবার জেটিতে থাকা জাহাজ থেকে কোনো কনটেইনার যেমন নামছে না, তেমনি জাহাজে কোনো কনটেইনার উঠছেও না। এক কথায় সম্পূর্ণ অচল হয়ে আছে দেশের প্রধান এ সমুদ্রবন্দর।

এ বিষয়ে আন্দোলনকারীদের নেতা হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশবিরোধী কোনো চুক্তি আমরা হতে দেব না। ইতিমধ্যে আমাদের আন্দোলনের কারণে সরকার চুক্তি থেকে পিছু হটেছে। বন্দর এখন পুরোপুরি অচল। সরকারের কাছ থেকে চুক্তির বিষয়ে ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আমাদের অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি চলবে।’

চুক্তির অবস্থা কী : পিপিপির আওতায় হতে যাওয়া সরকার টু সরকার চুক্তির পলিসিতে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দরকষাকষি চলছে। আর এ দরকষাকষির আভাস পেয়েই বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতাকর্মীরা গত বৃহস্পতিবার আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা দেন। এখন সেই চুক্তি কোন পর্যায়ে রয়েছে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পিপিপি কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলে চারটি পয়েন্টের বিষয় উঠে এসেছে। এই চার পয়েন্টের কারণে চুক্তি বিলম্বিত হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিপিপি কর্তৃপক্ষের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, চুক্তিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কিছু মেজর বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে। এসব পার্থক্য এখনই মিটছে না। তাই নির্বাচনের আগে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ মনে হচ্ছে।

কোন চারটি পয়েন্ট নিয়ে মতপার্থক্য : শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচি চুক্তিতে একটি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই চার পয়েন্টের মধ্যে এটি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। প্রথমত, শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গিয়ে চুক্তি করা যাবে কি যাবে না? আর গেলেও সেটা কতটুকু লাভবান হবে? দ্বিতীয়ত, ডিপি ওয়ার্ল্ড এককালীন কত টাকা বন্দরকে দেবে?

তৃতীয়ত, কনটেইনারপ্রতি ডিপি ওয়ার্ল্ড কত নেবে এবং বন্দর কত পাবে? চতুর্থত, কত বছরের মেয়াদে এ চুক্তি হবে এবং ১০ বা ১৫ বছর পর ইকুইপমেন্ট স্থাপনে ডিপি ওয়ার্ল্ড বিনিয়োগ করবে কি না?

এসব বিষয়ে বন্দরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০০৭ সালে এনসিটি টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৭০০ কোটি টাকা, প্রায় ১২০০ কোটি টাকা খরচ করে ১৪টি ‘কি গ্যান্ট্রি ক্রেন’সহ আধুনিক ইকুইপমেন্ট স্থাপন করা হয়েছিল ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে। পরে আরও প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে এনসিটির পেছনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে।

অন্যদিকে চীন থেকে আসা প্রতিটি কি গ্যান্ট্রি ক্রেনের মেয়াদ ২০ বছর। সে হিসাবে ২০৪২ সালের পর এসব কি গ্যান্ট্রি ক্রেনের কর্মক্ষমতা পর্যায়ক্রমে কমে আসবে। এখন প্রশ্ন হলো ডিপি ওয়ার্ল্ড যদি ১৫ বছরের চুক্তি করে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই হারে কনটেইনারপ্রতি টাকা বন্দরকে দেবে কি না? এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাভাবিকভাবেই সময় যত গড়াবে, এনসিটির ইকুইপমেন্টের কর্মক্ষমতা তত কমে আসবে। তাই শেষের দিকে নতুন ইকুইপমেন্ট স্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। আবার প্রথমদিকে কনটেইনারপ্রতি যে রেট হবে, শেষের দিকেও একই হারে বন্দর পাবে কি না এমন অনেক বিষয়ে নেগোসিয়েশনের জায়গা রয়েছে।

রেড সি গেটওয়ে যেখানে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ২২ বছরের জন্য এবং এপি মুলার পতেঙ্গার লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ৪৫ বছরের চুক্তি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে; সেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তির মেয়াদ কতে বছর হবে?

এনসিটিকে পিপিপির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বরাদ্দ দেওয়া যায় না মন্তব্য করে আন্দোলনকারী নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘নতুন ভূমিতে বিনিয়োগের জন্য বিদেশি কোম্পানিকে বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। যেমন : এর আগে লালদিয়া টার্মিনালকে দেওয়া হয়েছে। বে-টার্মিনালে পিএসএ সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। কিন্তু বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক ও রেডিমেড টার্মিনাল এনসিটিকে আমরা কেন বিদেশি কোম্পানিকে দেব?’

তিনি আরও বলেন, ‘বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক এ টার্মিনালকে আমরা বিদেশি কোনো কোম্পানিকে পরিচালনার জন্য দিতে দেব না। আর এ কারণেই আমাদের আন্দোলন চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে বন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম।’

চুক্তি ও বন্দরের অচলাবস্থা বিষয়ে কথা বলতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এর আগে মঙ্গলবার সংবাদকর্মীদের ব্রিফিংয়ের সময় চুক্তির বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘চুক্তির বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি। সেখান থেকে কোনো নির্দেশনা এলে জানানো হবে।’

চলছে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি : এদিকে আন্দোলনকারী নেতারা বুধবার ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতির কর্মসূচি দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি চলবে বলে ঘোষণা দেন। আর এ ঘোষণার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নগরীর বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে সল্টগোলা রেলক্রসিং পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কে একসময় ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরির দীর্ঘ লাইন থাকলেও এখন অচেনা পরিবেশ। একসময়ের যানজটপূর্ণ এলাকাটি এখন একেবারে যানবাহনমুক্ত। বন্দর ব্যবহারকারীরা এ অচলাবস্থা নিরসনের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নিতে বললেও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই।

চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমের প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ এ টার্মিনালে হয়ে থাকে। লাভজনক এই রেডিমেড টার্মিনালটি বিদেশিদের বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে আন্দোলনকারীদের আপত্তি। এনসিটি টার্মিনাল নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে করা রিট খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। গত বৃহস্পতিবার বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। রিটের বিষয়ে দেড় মাসেরও বেশি সময় আগে হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভক্ত রায় দিয়েছিল। ওইদিনের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে রিট ও রুল খারিজের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এতে বিদেশিদের (ডিপি ওয়ার্ল্ড) বরাদ্দ দিতে কোনো আইনগত সমস্যা নেই। আর এরপর থেকেই আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বন্দরের জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত