মুন্সীগঞ্জ-পঞ্চগড়ে গোলাগুলি হামলায় আহত ২০

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ভোটের মাঠ। প্রার্থীরা ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। বিভিন্ন স্থানে করছেন নির্বাচনী সমাবেশ। সেসব সমাবেশে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন বাক্যবাণে। প্রচারের এসব পর্বে কখনো কথার লড়াই থেকে হয়ে যাচ্ছে হাতাহাতি-সংঘর্ষ। গত শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার বিকেল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনকেন্দ্রিক এসব সংঘাত-সংঘর্ষে ঘটেছে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও। গতকাল মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের জেলা সদরের মোল্লাকান্দিতে স্বতন্ত্র ও বিএনপি প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা, গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষে গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া গত শুক্রবার পঞ্চগড়-২ আসনে বিএনপি ও জামায়াত একাধিক স্থানে সংঘর্ষে জড়ায়। সেসব সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যানসহ অন্তত ২০ জন। শুক্রবার রাতে নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের নির্বাচনী এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর নির্বাচনী অফিসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। নীলফামারী-২ (সদর) আসনে ধানের শীষের ব্যানার, ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা এবং ধানের শীষের প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন বিএনপি প্রার্থী। গতকাল সকালে মেহেরপুর-২ আসনের বিএনপি দলীয় প্রার্থী আমজাদ হোসেনের নির্বাচনী অফিসের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে দুটি হাতবোমা।

দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত:

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল দুপুর ১২টার দিকে জেলা সদরের মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মুন্সীকান্দি গ্রামে জেলা বিএনপির সদ্য বহিষ্কৃত সদস্য সচিব স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিন ও বিএনপি প্রার্থী মো. কামরুজ্জামান রতনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় উভয়পক্ষই একে অন্যের বিরুদ্ধে হামলা ও গুলির অভিযোগ করেছেন। পুলিশ বলছে, উভয়পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পূর্ব থেকে বিরোধ চলে আসছিল। ভোটের সামনে দুই প্রার্থীর হয়ে তারা মারামারিতে লিপ্ত হয়।

স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের (ফুটবল প্রতীক) সমর্থক মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মো. জিয়াউর রহমান জানান, এদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নোয়াদ্দা গ্রাম থেকে ফুটবল প্রতীকে ভোট প্রার্থনার লক্ষ্যে প্রচারণা শুরু করেন কয়েকশ সমর্থক। নোয়াদ্দা গ্রামে প্রচারণা শেষ করে দুপুর ১২টার দিকে তারা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মুন্সীকান্দি গ্রামে প্রবেশ করেন। এ সময় অতর্কিতে ধানের শীষ প্রতীকের সমর্থিত সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উজির আলী ও মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ মোল্লার লোকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় ধানের শীষের সমর্থকরা আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলিবর্ষণ ও ককটেল ছুড়ে মারেন। এতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর অন্তত চার সমর্থক গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন বলে দাবি করেন ওই যুবদল নেতা।

বিএনপি প্রার্থীর ধানের শীষ প্রতীকের সমর্থক মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উজির আলী বলেন, আমি ঢাকায় থাকি। মুন্সীকান্দি গ্রামে স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোকজন আমার ভাইকে মারধর করলে মারামারি বাধে।

মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আতাউর করিম বলেন, লিজন নামের একজনের শরীরে ককটেল বিস্ফোরণের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় জালালকে এ হাসপাতালেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সদর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সজিব দে বলেন, সেখানে দুই প্রার্থীর লোকজনের মধ্যে মারামারি হয়েছে। মূলত পূর্বের আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জের ধরে নির্বাচনের সামনে দুই প্রার্থীর পক্ষে ওই দুটি পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। তবে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, পঞ্চগড়-২ (বোদা-দেবীগঞ্জ) আসনে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে দুই দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় ১৫ জন আহত হয়েছে। গত শুক্রবার বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নে একটি নির্বাচনী জনসভাকে কেন্দ্র করে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনার একপর্যায়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দুই দলের সমর্থকরা। পুলিশ এবং সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এদিকে পৃথক আরেকটি ঘটনায় পঞ্চগড়-২ আসনের দেবীগঞ্জ উপজেলার দণ্ডপাল ইউনিয়নে ধানের শীষের নির্বাচনী জনসভা শেষে বাড়ি ফেরার পথে আনুমানিক রাত সাড়ে ১০টায় দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলায় কালীগঞ্জ নামক স্থানে পাঁচপীর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অজয় কুমার রায় ও বোদা সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অখিল চন্দ্র শীষ বাবুকে গুরুতর জখম অবস্থায় স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করেছে। এ সময় তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি ভেঙে চুরমার করে দেয় দুর্বৃত্তরা।

এ ঘটনায় বিএনপি প্রার্থী ফরহাদ হোসেন আজাদ দুজন সনাতনী সম্প্রদায়ের নেতা ও জনপ্রতিনিধির ওপর ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীসহ কর্মী-সমর্থকদের উগ্রতাকে দায়ী করেন। ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, আমরা অত্যন্ত সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সঙ্গে আগামী নির্বাচন উৎসব আকারে পালন করতে চাই। বিএনপি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কেউ কোনো অপতৎপরতা চালালে প্রশাসনকে সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করব।

জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী সফিউল্লাহ সুফি বলেন, আজাদ ভাই না হয় আমি এমপি হব। আপনারা শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখবেন।

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের নির্বাচনী এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর নির্বাচনী অফিসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার গভীর রাতে উপজেলার ১৩ নম্বর রসুলপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সেতুভাঙ্গা এলাকায় নির্বাচনী কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বেগমগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী ও নোয়াখালী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা বোরহানউদ্দিন বলেন, ‘গণতন্ত্রের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করতে এবং ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে রাতের আঁধারে এই কাপুরুষোচিত হামলা চালানো হয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে এর সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

এ বিষয়ে বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি মো. শামসুজ্জামান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ঘটনায় কারা জড়িত তা খুঁজে বের করতে তদন্ত চলছে।

নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, নীলফামারী-২ (সদর) আসনে ধানের শীষের প্রচার ব্যানার, ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা এবং তিনজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে ধানের শীষের প্রচার করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ওই আসনের ধানের শীষের প্রার্থী প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকালে মেহেরপুর-২ আসনের বিএনপি দলীয় প্রার্থী আমজাদ হোসেনের নির্বাচনী অফিসের পাশ থেকে দুটি বোমা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, আমতলী গ্রামের জগত আলীর চায়ের দোকানের সঙ্গে সংলগ্ন ওই নির্বাচনী অফিসের বাইরে দেয়ালের পাশে ব্যানারের নিচে লাল স্কচটেপে মোড়ানো দুটি কৌটায় তৈরি বোমা কে বা কারা রেখে গেছে। সকালে অফিস খুলতে গিয়ে বোমা দুটি দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ বোমা দুটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়। গাংনী থানার ওসি উত্তম কুমার দাস জানান, পুলিশ উদ্ধারকৃত বোমা দুটি নিষ্ক্রিয় করতে পানিভর্তি বালতিতে চুবিয়ে রেখেছে। এ ব্যাপারে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত