কিংবদন্তী ডেনিস লিলির চেইন গলায়, ইতালির বিশ্বকাপ স্বপ্নের এক্স–ফ্যাক্টর টমাস ড্রাকা

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২০ পিএম

ইতালির ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে নামার আগে দলের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছেন ফাস্ট বোলার টমাস ড্রাকা। অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া এই পেসারের গলায় ঝুলছে একটি বিশেষ চেইন—অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি ফাস্ট বোলার ডেনিস লিলির ব্যবহৃত ‘ওয়ার্ল্ড সিরিজ’ চেইন। ড্রাকার কাছে এটি শুধু স্মারক নয়, বরং তাঁর ক্রিকেটীয় জীবনের প্রেরণার প্রতীক।

চেন্নাইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচে ১১২ রানের বড় জয়ের পর আলোচনায় আসেন ২৫ বছর বয়সী ড্রাকা। ঘণ্টায় প্রায় ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে সক্ষম এই পেসারকে ঘিরেই ইতালির বোলিং আক্রমণের বড় আশা। সোমবার স্কটল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে ইতালির বিশ্বকাপ। 

ড্রাকার জীবনপথ যেমন বহুজাতিক, তেমনি বৈচিত্র্যময় তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারও। ইতালিয়ান মা ও যুগোস্লাভিয়ান বাবার সন্তান ড্রাকার জন্ম অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। শৈশবে ফুটবলের প্রতি ঝোঁক থাকলেও পরে ক্রিকেটেই মনোযোগী হন তিনি। পড়াশোনা ও ক্রিকেটের কারণে পরে যুক্তরাজ্যে যান, সেখান থেকে কানাডা, নেপাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের লিগ ঘুরে এখন ভারতের বিশ্বকাপ মঞ্চে ইতালির জার্সিতে।

ডেনিস লিলির সঙ্গে ড্রাকার সম্পর্কটা পারিবারিক। বাবার মাধ্যমে পরিচয়, পরে নিয়মিত অনুশীলন সেশন থেকেই গড়ে ওঠে গভীর বন্ধন। ড্রাকা লিলিকে ‘আঙ্কেল’ বলে ডাকেন। লিলিই তাঁকে পেশাদার ক্রিকেটে ক্যারিয়ার গড়ার পরামর্শ দেন এবং ২১তম জন্মদিনে নিজের ব্যবহৃত ‘ওয়ার্ল্ড সিরিজ’ চেইনটি উপহার দেন, যাতে রয়েছে লিলির টেস্ট ক্যাপ নম্বর ও স্বাক্ষর। বিশ্বকাপে সেটিই গলায় ঝুলিয়ে খেলতে চান ড্রাকা।

ড্রাকার মতে, লিলির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কঠোর পরিশ্রম আর সর্বোচ্চ ফিটনেস। স্ট্রেস ফ্র্যাকচারে ভোগার সময় লিলির সোজাসাপ্টা পরামর্শ ছিল, স্প্রিন্টারের মতো দৌড়ঝাঁপ ও ট্রেনিং করতে হবে। সেই অভ্যাস আজও ধরে রেখেছেন তিনি।

২০২২ সালে এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে গিয়ে যুক্তরাজ্যে নতুন করে নিজের ক্রিকেট গড়ে তোলেন ড্রাকা। ২০২৪ সালে সমারসেটের প্রথম একাদশের বিপক্ষে অনানুষ্ঠানিক তিন দিনের ম্যাচে টম ব্যান্টনকে দুইবার আউট করা এবং জেমস রিউকে বোল্ড করাই তাঁকে টি–টোয়েন্টি স্কাউটদের নজরে এনে দেয়।

ইতালির জার্সিতে টমাস ড্রাকা

এরপর দ্রুতই সুযোগ আসে কানাডা টি–টোয়েন্টি লিগ ও নেপাল প্রিমিয়ার লিগে। আইএলটি–টোয়েন্টিতে এমআই এমিরেটসের রিজার্ভ খেলোয়াড় হন, ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে বার্বাডোস রয়্যালসের সঙ্গে অনুশীলন করেন এবং ২০২৫ মৌসুমের আগে আইপিএল নিলামের দীর্ঘ তালিকাতেও জায়গা করে নেন।

কানাডা লিগে ব্র্যাম্পটনের হয়ে ছয় ম্যাচে ১১ উইকেট নিয়ে দলের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন ড্রাকা। সেখানেই ডেভিড ওয়ার্নারের কাছ থেকে পাওয়া একটি ছোট পরামর্শ তাঁর মানসিকতায় বড় পরিবর্তন আনে। প্রথম ম্যাচে স্নায়ুচাপে ঠিকভাবে বল করতে না পারায় ওয়ার্নার তাঁকে বলেন, ‘জাস্ট লেট ইট রিপ’। ড্রাকার ভাষায়, সেই কথাই তাঁকে ভয়মুক্ত করে দেয় এবং বড় ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাস এনে দেয়।

এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাতে আইএলটি–টোয়েন্টিতে খেলার সময় কাইরন পোলার্ড ও নিকোলাস পুরানের মতো তারকাদের কাছ থেকেও টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটের কৌশল শেখার সুযোগ পান তিনি। পাশাপাশি বার্বাডোসে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী কার্লোস ব্র্যাথওয়েটের সঙ্গে অনুশীলন করেন এবং তাঁকেও নিজের একজন গুরুত্বপূর্ণ মেন্টর হিসেবে দেখেন ড্রাকা।

ফাস্ট বোলিং কোচ শাহবাজ চৌধুরী ও ডেনিস লিলির তত্ত্বাবধানে নিজের বোলিং অ্যাকশন নতুন করে গড়ে তুলেছেন ড্রাকা। তাঁর দাবি, আগে যেখানে গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৮০ মাইলের আশপাশে, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ মাইলের কাছাকাছি। গতিই তাঁর বড় শক্তি হলেও ম্যাচ পরিস্থিতি বুঝে বল করাকেই তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

ভারতে অনুষ্ঠিত এই টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপই ইতালির প্রথম বিশ্বকাপ। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে তাদের অভিযান। তবে ড্রাকার লক্ষ্য শুধু মাঠের ফল নয়। তাঁর মতে, ইতালিতে ক্রিকেটের পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই—এমনকি ভালো টার্ফ উইকেটও খুব সীমিত। এই বিশ্বকাপ থেকে যদি দেশের ক্রিকেটে অর্থায়ন ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়, সেটাকেই তিনি নিজের ও দলের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

ইতালিয়ান ভাষায় সাবলীল না হলেও দলের গান শুরু হলে ব্যাট ঠুকেই উদ্‌যাপনে মেতে ওঠেন ড্রাকা। ডেনিস লিলির দর্শন আর ডেভিড ওয়ার্নারের কথায় পাওয়া সাহসকে সঙ্গী করেই ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপে ইতালির হয়ে নতুন অধ্যায় লেখার স্বপ্ন দেখছেন এই পেসার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত