বড় দুই দলের ইশতেহার ‘অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী’

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫১ এএম

প্রধান দ্ইু দলের নির্বাচনী ইশতেহার অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী ও ব্যয়বহুল বলে মন্তব্য করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংস্থাটি অভিমত, বিএনপির ইশতেহারে প্রতিশ্রুত এক কোটি কর্মসংস্থান, ২০৩৫ সালের মধ্যে অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণ, ক্রমান্বয়ে চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ইত্যাদি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অন্যদিকে জামায়াতের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে সবার আগে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। করের আওতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি; সরকারি নিয়োগ, বিনিয়োগ, ক্রয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে মেধাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে লোকসান কমিয়ে আনা গেলে ইশতেহার বাস্তবায়ন সম্ভব হতে পারে। সুজন মনে করে, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও আয়বৈষম্য ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা। কিন্তু দলগুলোর ইশতেহারে এসব সমস্যার টেকসই সমাধানের রূপরেখা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।

গতকাল সোমবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে সুজন আয়োজিত ‘কোন দলের কেমন ইশতেহার?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পাঁচটি দলের দেওয়া ইশতেহারে মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। দলগুলো হলো বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও সিপিবি। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার, সভাপতিত্ব করেন সুজনের কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। সঞ্চালক ছিলেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।

রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে এবার কোনো নতুনত্ব আছে কি না, সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের উত্তরে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কিছু দল নীতিনৈতিকতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে, আবার কিছু দল ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিটি দলই মূলত ভালো কথার ‘ফুলঝুরি’ দিয়ে সাজিয়েছে।

কোন দলের ইশতেহার অধিকতর ভালো এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তা নির্দিষ্ট করে বলা অসম্ভব। কোনো একটিকে অন্যটির চেয়ে সরাসরি সেরা বা খারাপ বলা কঠিন। বরং খাতওয়ারি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনোটিতে নির্দিষ্ট কিছু দিক আছে আবার কোনোটিতে নেই। বিস্তারিত পর্যালোচনা ও বিভিন্ন ডাইমেনশন থেকে দেখলে প্রতিটি ইশতেহারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলো ধরা পড়বে।’

লিখিত বক্তব্যে দিলীপ কুমার বলেন, অর্থনৈতিক নীতি বিশ্লেষণে দলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড স্বল্পমেয়াদে দারিদ্র্য লাঘবে সহায়ক হতে পারে। তবে এ নীতি পুরোমাত্রায় বাস্তবায়ন করতে গেলে এর অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতার প্রশ্নে স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। কৃষক কার্ডের আওতায় প্রতিশ্রুত ভর্তুকির পরিমাণ স্পষ্ট নয়। ধনীদের করের জালে আবদ্ধ করতে বিএনপির পরিকল্পনা বিত্তশালীদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, জামায়াত ১৯ শতাংশ আয়কর ও ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রস্তাবের মাধ্যমে করব্যবস্থায় সংস্কারের কথা বলেছে। এ প্রস্তাব বিনিয়োগবান্ধব হলেও রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সক্ষমতা ও সামাজিক ব্যয় বহনের প্রশ্নে বিতর্ক সৃষ্টি করবে। এনসিপি ভবিষ্যৎমুখী ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি, যুব কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ ও ডিজিটাল শিল্পকে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে। এ দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সিপিবি ও ইসলামী আন্দোলন কর্মসংস্থানকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখছে। তবে সিপিবি সমাজতান্ত্রিক পুনর্বণ্টন কাঠামোর ওপর জোর দেয়, যেখানে ইসলামী আন্দোলন কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাকে ধর্মীয় নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করে।

সুজনের বিশ্লেষণে বলা হয়, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিএনপি সার্বভৌমত্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির কথা বলেছে। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন মুসলিম বিশ্বকেন্দ্রিক সংহতির ওপর জোর দিয়েছে। এনসিপি বাস্তববাদী ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক অবস্থান নিয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে ইশতেহারগুলোয় জিও-পলিটিকস তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত। স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলা হলেও সব দলের কৌশলগত দিকনির্দেশনা দুর্বল মনে হচ্ছে।

সুজন বলেছে, সব দলের ইশতেহারের বড় দুর্বলতা হলো কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কত টাকা লাগবে, সেই টাকা কোথা থেকে আসবে, তার স্পষ্ট হিসাব নেই। ফলে নাগরিকদের মধ্যে ইশতেহারের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

সুজনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পাঁচটি দলই মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব স্বীকার করলেও তাদের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। মৌলিক বিষয়ে তাদের ঐকমত্য থাকলেও রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় ভিন্নতা স্পষ্ট।

পাঁচটি দলই জুলাই সনদের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান নিলেও তাদের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। বিএনপি ও এনসিপি এই সনদকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ভিত্তি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন নৈতিক শাসনের সুযোগ এবং সিপিবি রাষ্ট্র সংস্কারের কাঠামো হিসেবে দেখছে।

সুজন বলছে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তাদের জুলাই সনদে দেওয়া নোট অব ডিসেন্টের (আপত্তি) সূত্র ধরে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো গঠনে তাদের সুবিধামতো নীতিমালা তৈরি করবে। একইভাবে বিএনপির ইশতেহারে উচ্চকক্ষ গঠনে সনদের বিপক্ষে অবস্থান দেখা গেছে। অন্যদিকে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন ও সিপিবি জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে ঘোষণা দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত