স্বতঃস্ফূর্ত ও সহজ ভালোবাসার গান

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৩ এএম

মানুষ কোনো বস্তু নয়। মানুষ হস্তান্তরযোগ্য নয়। মানুষ মানুষের সম্পত্তি নয়। তবু কেন আমরা বলি তুমি শুধু আমার, আর কারুর নয়! কারুর পক্ষেই কি সম্ভব সকল উজাড় করে দেওয়া? নিজেও নিজের কাছে না থাকা? সম্ভব হয়তো! নইলে রবীন্দ্রনাথ কেন বলেছেন

‘আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়।/আমি তার লাগি পথ চেয়ে আছি পথে যে জন ভাসায়।।’

আর আমরা এসব কথাকে তুচ্ছজ্ঞান করার স্পর্ধা কি রাখি যখন প্রেমে ভাসি-ডুবি? প্রেমেপড়া মানুষের সঙ্গে পাগলের পার্থক্য কই! এই অসুখ মানুষ স্বেচ্ছায় বরণ করে। নিজেকে মাথায় তুলে নিজেই আছাড় মারে। আহা, প্রেম। আহা, বিরহ...

‘বিরহ মধুর হল আজি মধুরাতে।

গভীর রাগিণী উঠে বাজি বেদনাতে।।

ভরি দিয়া পূর্ণিমানিশা অধীর অদর্শনতৃষা

করুণ মরীচিকা আনে আঁখিপাতে।।’

যে মানুষ ভালোবাসা বোঝে না, তাদের মতো গরিব পৃথিবীতে হয় না। যারা ভালোবাসার নাম করে অপমান করে, অত্যাচার করে দীনহীন তারা।

‘দুই দীর্ঘশ্বাসের মধ্যিখানে, মৃত্যু, আমি তোমাকে জন্মাতে দেখেছি।’

কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর এই কবিতাটার নাম এপিটাফ। মৃত্যু হলো কোলের শিশু। কাঁখে নিয়ে ঘুরছি। চুমু খাই, আদর করি। ফলে সে বশে আছে। মনতাড়িত মানুষের বেদনা শতগুণ। তারা বুদ্ধির চেয়ে মনকে এগিয়ে রাখে। তখন মানবিক অনুভূতি মার খেয়ে যায় চালাকিপনার কাছে। তারপর পৃথিবীকে ভীষণ অসুন্দর লাগে, জীবনকে অসুন্দর লাগে। এ-ই মনে হয় খুব করে বাঁচতে হবে, তার পরক্ষণেই মনে হয় পৃথিবীর কাছে, মানুষের কাছে তেমন কিছু চাওয়ার নেই। পাওয়ার নেই। আর চাইলেও কিছু দেওয়ার সক্ষমতা এই পৃথিবীর মানুষের নেই।

আমরা কী করি, নিজেকে টিকিয়ে রাখার প্রবণতার কারণেই হয়তো কিছু না কিছু আঁকড়ে ধরতে চাই। এক মানুষ সম্মোহন করে খাদের কিনারে নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আসে। অন্যদিকে অন্য কেউ হয়তো হাত বাড়িয়ে জীবন চেনায়। একজনের কাছে দুঃখ পেয়ে আমরা অন্যজনের কাছে যাই। মুখ গুঁজে কাঁদি। কিন্তু যারা চিরকালীন হেরো! তাদের তিক্ততায় জিভ আড়ষ্ট হয়। শতজন্মের খিদে নিয়ে অমৃতের সন্ধান করে। পায় না। গলাধাক্কা, অপমান আর তাচ্ছিল্যের গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে তারা ভাবে এই বেঁচে থাকার চে মৃত্যু কী যে সুন্দর!

মৃত্যুর পর মানুষের সংসার থাকে না। সন্তান থাকে না। প্রেম-ভালোবাসার আকাক্সক্ষা থাকে না। তারা সব কাক্সক্ষার ঊর্ধ্বে। এক জীবনে সহস্র মরণ দেখে তারাই, যারা জানে জীবনের ধর্ম শত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধতার ভেতর টিকে থাকা। ফলে এই শত মৃত্যুর যন্ত্রণা তাদের চাক্ষুষ করতে হয় না।

মানুষ মানুষকে মেরে ফেলে। এমনভাবে মারে যে সে লাশ আর জীবন পায় না। সে লাশ মানুষ কি নিজের ভেতর পুষে রাখে না? এই লাশ কি শরীরের মৃত্যু পর্যন্ত বয়ে বেড়ায় না?

এই তো গেল না হয় ব্যক্তির একান্ত মানবিক অনুভূতির কথা। কোথায় ভালো থাকি মূলত আমরা? দেশ কি আমাদের জীবন ও যাপনের বাইরে, আলাদা কিছু? আমাদের অন্যসব অনুভূতির ঊর্ধ্বে! দেশে আক্রান্ত হলে, মা আক্রান্ত হলে, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত এলে কেউ কি নিজেকে লুকোতে পারে সহজ কোনো অরণ্যে? কোথায় সে জগৎ, কোন সে অরণ্য; কেমন সে সহজ হাওয়া, যা আমাদের নিঃশ্বাস বিষমুক্ত রাখে?

বেশ কয়েক মাস থেকে দেশ আক্রান্তের একটা ট্রমা বয়ে বেড়াচ্ছি। আমি, আমরা। কারণ দেশ একটা ভূখণ্ড নয় শুধু, এটা একটা অনুভূতিরও নাম। এটা অনুভব করা যায়, দেশ থেকে দূরে থাকলে। দেশের মানুষগুলোরও কত দোষ দেখি হামেশাই, কিন্তু দেশ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে তাদের ভালোটা খুব জ্বলজ্বল করে।

এখন সব জায়গায় ছদ্মবেশী ধর্মান্ধদের উৎপাত। তাদের মগজে ধর্মের বিষ আর ওপরে ওপরে একটা প্রগতির খোলস। না তারা ভালো করে ধর্মটাকে জানে, না তারা বইপত্র পড়ে নিজের চিন্তার বিকাশ ঘটায়। রাষ্ট্র তো কবেই মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করেছে। আর এখন প্রতিটি মানুষই হিংস্র, চোখমুখে রক্তক্ষুধা। চুরি, ঘুষ, খুন-গুম, ধর্ষণ কিছু নিয়েই তাদের বিকার নেই। যেন তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে ধর্ম রক্ষা করা। ধর্ম কবে থেকে এত পলকা হয়ে গেল? এত অল্পেই যে ধর্ম আহত হয়, সেটা কি আদতে রক্ষা করা যায়? ধর্ম রক্ষা করতে গিয়ে তারা অন্যের জীবন ও যাপনে ঢুকে পড়ে, নিজেদের বাঁচা ছেড়ে রেখে অন্যের জীবনে গিয়ে বাঁচে।

যে গুটিকয়েক মানুষ এখনো ভাবে এ দেশ সব মানুষের, সব শ্রেণির, নিজের কথা নির্ভয়ে বলার অধিকার আছে; মনে হচ্ছে, তারা কোথাও আর নিরাপদ নয়। যে কেউ হামলে পড়তে পারে আগাম সংকেত ছাড়াই। কারণ ধর্মের আফিম খাওয়া অসংলগ্ন মানুষ চিন্তায় আর ঠিক মানুষ নেই। একেকটা হয়ে উঠেছে হিংস্র জানোয়ার।

যে রাষ্ট্রব্যবস্থা, যে সমাজ চুরি, দুর্নীতি, ধর্ষণের চেয়েও গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখে দুটো নারী-পুরুষের আলিঙ্গন, চুমু খাওয়াকে... ‘এখানে অসামাজিক কার্যকলাপ নিষেধ’ বলে পার্কে, অলিগলিতে, গাড়িঘোড়ায় সাইনবোর্ডে ঝুলিয়ে রাখে, সেখানে মানুষ খুনের মতো বড় অপরাধের চেয়েও মানুষকে মনোযোগী করে তোলে মানব-মানব-মানবীর প্রেম, ভালোবাসাকে। এই এমন সহজাত প্রবৃত্তিকে অপরাধ হিসেবে দাগিয়ে না দিয়ে বরং সহজ করে দিতে হবে। সত্য ও স্বাভাবিকতাকে মেনে নেও সংস্কৃতি গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন। নদীর স্রোতে বাঁধ না দিয়ে বরং চলাকে সহজ করার সহনশীল চোখ ও মনন তৈরি করতে হবে।

লেখক : কবি ও কথাকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত