যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরেন তারেক রহমান। এর দেড় মাসের মাথায় তাকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচন এটি। দেশে ফিরে তারেক রহমান বলেছিলেন, তার একটি পরিকল্পনা আছে এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলা তারেক রহমানকে সে পরিকল্পনার পাশাপাশি বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বিষয়গুলো তুলে ধরেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরানোকে মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখছে বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, গত এক যুগের বেশি সময় ধরে ভেঙে পড়া গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক অবস্থার পুনর্জাগরণ ঘটানোর বিএনপির সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। এর আগে তারেক রহমানের কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়া কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকলেও, বাংলাদেশের জনগণ তাকে সুযোগ দিতে চায় বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক নাভীন মুরশিদ। বিবিসিকে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ নতুন ও ভালো কিছুর আশা দেখছে, আর এটিই তারেক রহমানের জন্য সেই রাস্তা প্রশস্ত করেছে। তবে অতীতে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নজিরও রয়েছে। তাই এবার শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, তার বাস্তবায়নও দেখতে চায় বাংলাদেশের তরুণরা। ছাত্র-জনতার সংঘটিত জুলাই অভ্যুত্থানের বরাত দিয়ে বিবিসি বলছে, নতুন সরকারের কাছ থেকে কথার ফুলঝুরির পরিবর্তে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মানবাধিকার বিষয়গুলোর উন্নতি দেখতে চান তরুণ প্রজন্ম। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশে অন্তত ১ হাজার ৪০০ লোক প্রাণ হারায়। এর আগে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বিচার বহির্ভূতভাবে গুমের শিকার হয় সাড়ে ৩ হাজার মানুষ। সেই ক্ষতগুলো এখনো বেশ তাজা। শেখ হাসিনার সময় যেসব প্রতিষ্ঠানে রাজনীতিকরণ হয়েছিল সেগুলোর ওপর এখন মানুষের আস্থা ফেরাতে তারেক রহমানকে কাজ করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে সেনাবাহিনী, আদালত, সিভিল সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এর আগে ক্ষমতায় বসেছিল ২০০১ সালে। এর পরপরই আওয়ামী লীগ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে ফিরে আসার পর থেকে তারেক রহমান ঐক্যের বাণী প্রচার করছেন। তিনি বলেন, প্রতিহিংসা কিছুই ফিরিয়ে আনবে না। বরং আমরা যদি এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি, দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি, তাহলে হয়তো ভালো কিছু পাব। আওয়ামী লীগের আমলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল দ্রুত বর্ধনশীল। জিডিপি ২০০৬ সালের ৭১ বিলিয়ন থেকে ২০২২ সালে ৪২০ বিলিয়নে পৌঁছায়। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বৈষম্য ও বেকারত্বের কারণে দলটির বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়।
হাসিনার পতনের পরও মানুষের জীবনযাত্রার মানের খুব একটা উন্নতি হয়নি। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার মান কমে যাওয়ায় সাধারণ পরিবারগুলোর প্রকৃত আয় সংকুচিত হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। অথচ যুব বেকারত্বের হার বর্তমানে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়েছে। এটি জ্বালানি সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রায় ৪ কোটির বেশি বাংলাদেশি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। এ অবস্থায় বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রচারে নারীদের ভাতা ও বেকারদের ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এতে অর্থায়ন কীভাবে হবে তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন আছে। এছাড়াও এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার কী অবস্থান নেয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিপরীতে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। নির্বাচনে জয়ের পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতীয় নেতারা। বিএনপির সঙ্গে ভারতের কাজ করার আগ্রহের ইঙ্গিতও দিয়েছেন তারা। তারেক রহমান কীভাবে এ বাধা উতরে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবেন সেটাই এবার দেখার অপেক্ষা।
