নারীসমাজের আলোকবর্তিকা নবীকন্যা ফাতিমা (রা.)

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৩১ এএম

নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সবচেয়ে আদরের কন্যা ছিলেন হজরত ফাতিমা (রা.)। একজন কন্যা, ধৈর্যশীল স্ত্রী, স্নেহময়ী মা এবং আদর্শ নারী হিসেবে তিনি ছিলেন অনন্য। ইমান, ত্যাগ, লজ্জাশীলতা ও আত্মমর্যাদার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা যুগে যুগে মুসলিম নারী সমাজের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। শৈশবে তিনি দেখেছেন মক্কার নির্যাতন। বাবার কাঁধে ময়লা ফেলা হলে নিজ হাতে তা সরিয়ে দিয়েছেন। অবরোধের দিনগুলোয় অভাবকে আলিঙ্গন করেছেন ধৈর্যের সঙ্গে। বিবাহের পর স্বল্প সামর্থ্যরে সংসারেও অভিযোগ করেননি। তার জীবন ছিল সহজ ও মহিমান্বিত। নবীজি (সা.) তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তিনি যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, নবীজি দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাতেন এবং নিজের আসনে বসাতেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি জান্নাতি নারীদের সর্দারদের অন্যতম। এই মর্যাদা কেবল রক্তের সম্পর্কের কারণে নয়, বরং তাকওয়া ও চরিত্রের সৌন্দর্যের জন্য।

নবুয়ত লাভের পর আল্লাহর হুকুমে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম তিন বছর গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। এরপর যখন প্রকাশ্যে আত্মীয়-স্বজন ও মক্কাবাসীকে সত্যের পথে আহ্বান করলেন, তখন শুরু হয় তীব্র বিরোধিতা। আবু লাহাব এবং কোরাইশ নেতারা তার বিরুদ্ধে শত্রুতায় নেমে পড়ে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন তার পুত্রসন্তানদের হারালেন, তখন কাফেররা তাকে নিয়ে উপহাস করতে লাগল। আস ইবনে ওয়ায়েল তাকে ‘আবতার’ অর্থাৎ নির্বংশ বলে কটূক্তি করত। বলত, ‘মুহাম্মদের কোনো ছেলে নেই, মৃত্যুর পর তার নাম পর্যন্ত থাকবে না।’ এই বেদনাদায়ক কথায় রাসুলুল্লাহ (সা.) গভীর মর্মপীড়া অনুভব করতেন। মহান আল্লাহ তার প্রিয় হাবিবের এই কষ্ট লাঘবের জন্য এক অনন্য নেয়ামত দান করলেন, তিনি হলেন হজরত ফাতিমা (রা.)।

হজরত ফাতিমা (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রিয়তম কন্যা এবং মুসলিম নারী সমাজের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার জীবনাচরণ প্রতিটি মুসলিম নারীর জন্য অনুকরণীয়। নবীজি (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘ফাতিমা বেহেশতের নারীদের নেত্রী।’ (সহিহ বুখারি ৩৬২৩) ১১ হিজরিতে পিতার ইন্তিকালের মাত্র পঁচাত্তর দিন পরই তিনি দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার জীবনের শেষ সময়ে ফাতিমা (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘আমার পরিবারের মধ্য থেকে তুমিই প্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে।’ (আদাবুল মুফরাদ ৭২৫)

আল্লাহভীতি, আত্মত্যাগ, বাকপটুতা এবং সাহিত্য-প্রজ্ঞাসহ সব মহৎ বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ এই মহান নারী শুধু নারী সমাজ নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্যই অনুসরণীয়। প্রাপ্তবয়স্ক হলে অনেক খ্যাতিমান সাহাবি তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু নবীজি (সা.) স্বীয় চাচাতো ভাই হজরত আলি (রা.)-এর সঙ্গে দ্বিতীয় হিজরিতে তার বিয়ে সম্পন্ন করেন। বিয়ের সময় তার বয়স ছিল পনেরো বছর পাঁচ মাস। মোহরানা ছিল মাত্র চারশ আশি দিরহাম।

হজরত আলি (রা.) অত্যন্ত সহজ-সরল জীবন অতিবাহিত করতেন। বিয়েতে রাসুলুল্লাহ (সা.) তার মেয়েকে যা দিয়েছিলেন, তা হলো  একটি চাদর, খেজুর গাছের আঁশ ভর্তি বালিশ, চামড়ার তৈরি বিছানা, দড়ির খাট, একটি মশক এবং একটি জাঁতা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ফাতিমা (রা.)-কে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ফাতিমা আমারই একটি অংশ। অতএব যে তাকে অসন্তুষ্ট করল, সে আমাকে অসন্তুষ্ট করল।’ (সহিহ বুখারি ৩৭১৪) নবীজি (সা.)-এর ইন্তিকালের সময় ফাতিমা (রা.) ছিলেন তার একমাত্র জীবিত সন্তান।

একবার নবীজি (সা.) সেজদারত অবস্থায় ছিলেন। অভিশপ্ত উকবা উটের পচা নাড়িভুঁড়ি এনে তার পবিত্র পিঠে নিক্ষেপ করল। দূরে দাঁড়িয়ে কোরাইশ নেতারা এ দৃশ্য দেখে হাসাহাসি করছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেজদা থেকে মাথা তুলতে পারছিলেন না। এই সংবাদ ফাতিমা (রা.)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি দ্রুত ছুটে গেলেন। গভীর মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে নিজ হাতে পিতার পিঠ থেকে ময়লা সরিয়ে পানি দিয়ে পরিষ্কার করে দিলেন।

হজরত আবু সালাবা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সফর থেকে ফিরে প্রথমে মসজিদে দুই রাকাত নামাজ পড়তেন। তারপর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। এটি ছিল তার নিয়মিত অভ্যাস।

একবার কোনো এক সফর থেকে ফিরলে ফাতিমা (রা.) তাকে স্বাগত জানাতে বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং নবীজির চেহারা ও কপালে চুমু দিয়ে কেঁদে ফেললেন। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাঁদছ কেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আপনার মুখমণ্ডল কষ্টে বিবর্ণ দেখাচ্ছে এবং গায়ের ছেঁড়াফাটা পোশাক দেখে আমার কান্না থামছে না।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘হে ফাতিমা! কেঁদো না। তোমার বাবা যে ইসলাম নিয়ে এসেছেন, তা অবশ্যই একদিন প্রতিটি ঘরে, এমনকি প্রতিটি তাঁবুতেও পৌঁছে যাবে।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ ৮/২৬৫)

হজরত ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার জীবন আমাদের সামনে এক অনন্য মানদণ্ড স্থাপন করে। তিনি প্রমাণ করেছেন, দুনিয়ার কষ্ট ও সংকীর্ণতা মানুষকে ছোট করে না, বরং ইমান ও ধৈর্য তাকে উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দেয়। তার ঘর ছিল সরল। জীবিকা ছিল সীমিত। কিন্তু হৃদয় ছিল পরিপূর্ণ আল্লাহভীতিতে এবং আখেরাতের প্রত্যাশায়।

আজকের পৃথিবীতে নারীকে নানা পরিচয়ে মূল্যায়ন করা হয়। বাহ্যিক সাফল্য, ভোগবিলাস কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে তার মর্যাদা নির্ধারণের চেষ্টা চলে। অথচ হজরত ফাতিমার জীবনী দেখায়, একজন নারীর প্রকৃত শক্তি তার চরিত্রে, লজ্জাশীলতায়, দায়িত্ববোধে এবং আল্লাহর প্রতি নিবেদনে। তিনি সংসার সামলেছেন, সন্তানদের আদর্শে গড়ে তুলেছেন, স্বামীর পাশে থেকেছেন এবং ইবাদতে কাটিয়েছেন গভীর রাত পর্যন্ত।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করতেন, তা নারী মর্যাদার এক বাস্তব শিক্ষা। এই সম্মান অর্জিত হয়েছিল তার তাকওয়া ও নৈতিক দৃঢ়তার মাধ্যমে। তাই তার জীবন কেবল স্মরণ করার বিষয় নয়, অনুসরণেরও বিষয়।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত