তদবির করলেই পুলিশে বদলি-নিয়োগ বাতিল

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৫ এএম

ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতির ও উন্নতির উদ্যোগ নিয়েছে নতুন সরকার। পুলিশকে জনবান্ধব, দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক করা, তাদের ভালো কাজের মূল্যায়ন করা, অহেতুক কাউকে হয়রানি না করাসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে নতুন সরকার। পুলিশের কোনো কর্মকর্তার বা সদস্যের ভালো স্থানে বা লোভনীয় পদে নিয়োগের তদবির করা হলে তা বাতিল করে দিতে সরকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

ওই সূত্রটি জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহেই পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনার ও র‌্যাব মহাপরিচালক নিয়োগ করতে যাচ্ছে সরকার। ইতিমধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন অন্তত ১৫ জন পুলিশ কর্তা। পুলিশপ্রধান ও ডিএমপি কমিশনার হিসেবে বিসিএসের ১৫তম ও ১৭তম ব্যাচের দুই কর্মকর্তাকে বেছে নেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম পর্যালোচনা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন, যারা যোগ্য, তেলবাজ নয় ও দুর্নীতিমুক্ত এবং পেশাদার তাদের যোগ্য স্থানেই নিয়োগ করার। তিনি চান, তোমাষোদকারীরা যেন ভালো স্থানে না থাকে; দলমত নির্বিশেষে দেশের জন্য কাজ করে; জনগণকে নিরাপদে রাখে এবং বাংলাদেশকে অপরাধমুক্ত করে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, নতুন সরকারের নির্দেশনা আমরা মানতে প্রস্তুত। নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও আজ (গতকাল) বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, তদবিরে পুলিশে বদলি বা নিয়োগ না হোক। প্রধানমন্ত্রী পুলিশকে ঢেলে সাজাবেন। আগামী সপ্তাহেই পুলিশপ্রধান, ডিএমপি কমিশনার ও র‌্যাব মহাপরিচালকের পদে নতুন কর্মকর্তা আসছেন। অনেক কর্মকর্তাই নিজেকে বিএনপির একান্ত সমর্থক হিসেবে দেখাচ্ছেন। আমার বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব বিবেচনায় নেবেন না।

গতকাল বিকেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন একান্ত সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ সূত্রে জানা গেছে, পুলিশকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যোগ্যতা অনুযায়ী পুলিশে পদোন্নতি ও দায়িত্ব দেওয়া হবে। পুলিশে তদবির-বাণিজ্য হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার ও র‌্যাব ডিজির পরিবর্তনের গুঞ্জন : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরই পুলিশের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন উঠেছে। বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমকে তার মেয়াদ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে বলা হলেও তিনি অপারগতা জানিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় তার পদত্যাগপত্র আমলে না নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মনে করেন, ক্লিন ইমেজের নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হলে কাজে গতি আসবে। বিসিএস ১৫তম ব্যাচের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের (ডিএমপি) প্রধানসহ পুলিশের অন্য ইউনিটগুলোর প্রধান এবং র‌্যাব ডিজি পদেও রদবদল আসতে পারে।

বিজিবি মহাপরিচালক পরির্বতনেরও গুঞ্জন : বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর পরিবর্তনের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠলেও তদন্তে প্রমাণ মেলেনি। নতুন সরকার আসতেই তার পরিবর্তনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে বলে একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে।

অবসরে যাওয়া কোনো কর্মকর্তা ফের কর্মস্থলে যেন না যান : পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, আসন্ন ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের নিরাপত্তা নিয়ে বর্তমান আইজিপি কাজ করলেও তার নিজ পদে মন নেই। তিনি চেষ্টা করেছেন পেশাদারিত্ব নিয়ে বাহিনীর কর্মকা- চালাতে। কিন্তু পুলিশের কিছু ‘দুষ্ট কর্মকর্তার’ কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তার চাকরির মেয়াদ ৯ মাস বাকি আছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, বাহিনীর প্রধান হিসেবে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে কাজে গতি আসতে পারে। নতুন আইজিপি হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন বিসিএস ১৫তম ব্যাচের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে সদ্য অতিরিক্ত আইজিপি পদ থেকে অবসরে যাওয়া আবু নাছের মোহাম্মদ খালেদ রয়েছেন। গণঅভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। যদিও অবসরে যাওয়া কোনো কর্মকর্তা যাতে আবার কর্মস্থলে আসতে না পারেন, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পুলিশের মেরুদ- ভেঙে দেয়। পেশাদারিত্ব নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের মনোবল নষ্ট হয়ে যায়।

আইজিপির দৌড়ে এগিয়ে যারা : পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, আইজিপি হওয়ার তালিকায় রয়েছেন ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা এপিবিএনের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি আলী হোসেন ফকির। আলোচনায় রয়েছেন হাইওয়ে পুলিশের প্রধান দেলোয়ার হোসেন ও রেলওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান। এসপি পদে থাকা অবস্থায় ২০২২ সালে চাকরি হারান জিল্লুর; ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যোগ দেন চাকরিতে। ঢাকার পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর এ পদে নিয়োগ পান, তিনিও আইজিপি হওয়ার চেষ্টা করছেন। যদিও পুলিশ কর্মকর্তারা তার কাজে অনেকটাই নাখোশ। বিসিএস ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) একেএম আওলাদ হোসেন, সিএমপির পুলিশ কমিশনার অতিরিক্ত আইজি হাসিব আজিজও চেষ্টা করছেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার পদেও পরিবর্তন করা হচ্ছে। ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা ও ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধান, অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) মাইনুল হাসান, র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) উপমহাপরিদর্শক ফারুক আহমেদ ও ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. সারওয়ারও চেষ্টা করছেন পুলিশ কমিশনার হতে। তাছাড়া র‌্যাব মহাপরিচালক শহিদুর রহমান চুক্তিতে থাকলেও আইজিপি হওয়ার চেষ্টা করছেন। তার স্থানে অতিরিক্ত আইজিপি আওলাদ হোসেনকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সরকার চিন্তাভাবনা করেছে বলে জানা গেছে। তাছাড়া র‌্যাবের ডিজি হিসেবে সিআইডির প্রধান, এপিবিএন, হাইওয়ে ও ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধানের নামও চিন্তা করছে নতুন সরকার।

জনগণের আশা পূরণেই আইজিপি নিয়োগে প্রাধান্য : পুলিশ সূত্র জানায়, রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর ভিত্তি করেই নতুন পুলিশপ্রধান নিয়োগ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকারের শীর্ষ মহল। পুলিশের কর্মস্পৃহা এবং নৈতিক ভিত্তির দুর্বলতা দৃশ্যমান। রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হওয়ার অভিযোগও পুলিশের বিরুদ্ধে পুরনো। এখন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর যে সমীকরণ তৈরি হবে তার ওপর ভিত্তি করেই নতুন পুলিশপ্রধান নির্বাচন করার চেষ্টা চলছে। পুলিশের ওপর মানুষের যে আশা সেটা পূরণ করা ও বাহিনীতে জবাবদিহি তৈরি করতে পারবে এমন একজনকেই এ পদে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। তিনি এমন একজনকে পুলিশপ্রধান করতে চান যার ক্লিন ইমেজ রয়েছে এবং পেশাদারিত্বের মধ্য দিয়ে পুরো বাহিনীকে এগিয়ে যাবেন। তারপরও পুলিশপ্রধান (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, র‌্যাব মহাপরিচালকসহ পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোর প্রধান হতে জোর লবিং শুরু হয়েছে। ইচ্ছুকরা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ করে চলেছেন। যেসব কর্মকর্তা অবসরে গেছেন, তারাও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে জোরালো তদবির করছেন।

গ্রুপিং বন্ধ ও সংস্কারের নির্দেশ : পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের ভেতর দলবাজির বিষয়টি একদিনে গড়ে ওঠেনি। এটি সব সরকারের আমলেই ছিল। আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশের ভেতর ১০ থেকে ১২টি গ্রুপ ছিল। ওইসব গ্রুপের নেতারা কারও নির্দেশই মানতেন না। বর্তমানে যারা দলবাজি করছেন, তারা একসময় চরম অবহেলিত ছিলেন। তাদের দিনের পর দিন প্রমোশন ও পোস্টিং দেওয়া হয়নি। নতুন সরকার পুলিশকে জনগণের আস্থার জায়গায় যদি ফেরাতে চান, তাহলে সংস্কার করে পুলিশের অভ্যন্তরীণ শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। যারা যোগ্য তারা যেন ভালো থাকেন, সে ব্যবস্থা করলেই ভালো।’

পুলিশের তদবিরে বিএনপি নেতারা : নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বড় বড় পদ পেতে পুলিশ কর্মকর্তারা বিএনপি নেতাদের কাছে তদবির করছেন। আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার, র‌্যাব মহাপরিচালক, হাইওয়ে, এসবি, সিআইডি, পিবিআই, এপিবিএনসহ পুলিশের ইউনিটপ্রধান হতে বিএনপির একাধিক মহলে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ১৬-১৭ বছর আগে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারাও পুলিশের শীর্ষ পদে আসার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। আমরা চাচ্ছি আর যেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দেওয়া হয়। এমন হলে পুলিশ রাজনৈতিক বেড়াজাল থেকে বের হতে পারবে কি না সন্দেহ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পজিটিভ থাকলে পুলিশ পরিবর্তন হবে।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু কর্মকর্তা ভালো স্থানে থেকেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। কেউ কেউ কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের তোষামোদি করছেন। এর থেকে আমাদের বের হয়ে আসতেই হবে। না হলে সামনে অন্ধকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত