ঈদুল ফিতরের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। এদিকে বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং জাতীয় পর্যায়ে নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়। সভা শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি শিগগিরই শুরু হবে।
এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী আগামীকাল শনিবারও অফিস করবেন বলে জানিয়েছেন তার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আতিকুর রহমান রুমন। দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করে রুমন বলেন, শনিবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে অফিস করবেন তারেক রহমান।
ঈদের আগেই ফ্যামিলি কার্ড : দুপুরে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বন ও পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বৈঠক থেকে বেরিয়ে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে কথা বলেন।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘ঈদের আগে রমজান মাসেই পাইলট প্রকল্প হিসেবে “ফ্যামিলি কার্ড” চালু হচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়টি বিস্তারিত উল্লেখ আছে। এটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে আজকে (গতকাল) আলোচনা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে, এ বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
কত পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি মূলত সর্বজনীন। এতে কোনো বিধিনিষেধ থাকবে না। তবে একটি কমিটি করা হয়েছে, হতদরিদ্র থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের এই সুবিধার আওতায় আনবে। রমজানেই কি এটি শুরু হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘ঈদের আগেই পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এটি চালু হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী চান পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে অন্তত ঈদের আগেই এটি শুরু করতে। এটি তো চালু হবেই, এটি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। আমরা শুধু মেকানিজম বা কার্যক্রমটি কীভাবে শুরু করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছি।’
ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড মায়েদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। কাজটি বাস্তবায়নে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই কমিটিতে রয়েছে। ঈদের আগে এটা বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে। তিনি বলেন, এই কার্ড হবে সর্বজনীন। কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় এখানে বিবেচ্য হবে না। কোনো ভায়া না হয়ে সরাসরি কীভাবে উপকার ভোগীর হাতে টাকা পৌঁছানো যায়, সে বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হবে। এখন যেসব কার্ড প্রচলিত আছে, সেগুলো চলমান থাকবে। এখন যা পাচ্ছে, প্রতি কার্ডে তার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি টাকা পাবে।
১৫ সদস্যের কমিটির কাজ : ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে একটি উপযুক্ত ডিজাইন প্রণয়ন এবং সুবিধাভোগী নির্বাচন পদ্ধতি প্রণয়ন, প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের প্রতিটিতে একটি উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড প্রবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ, নারীদের জন্য বিদ্যমান অন্য কোনো কর্মসূচিকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তা পর্যালোচনা, সুবিধাভোগীদের ডেটাবেজ প্রণয়নের লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডেটাবেজ আন্তঃসংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ডিজিটাল এমআইএস প্রণয়নের সুপারিশ এবং আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করার লক্ষ্যে কমিটি আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রণয়ন করবে।
হতদরিদ্র পরিবার সবার আগে পাবে : মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেছেন, বিএনপি ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা প্রথমেই হতদরিদ্র পরিবার পাবে। তিনি বলেন, ‘আজকের বৈঠকে ঈদের আগেই পাইলট প্রকল্প হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য বেশ কিছু জেলা ও উপজেলা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমে হতদরিদ্র পরিবারকে এই সুবিধা দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে এই সুবিধা বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় নগদ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। হতদরিদ্র পরিবারের নারীদের নগদ টাকা তাদের পরিবারের জন্য অনেক গুরুত্ব বহন করে। দু-এক দিনের মধ্যে ঠিক করা হবে প্রাথমিকভাবে কত মানুষ এ সুবিধা পাবেন।
শিগগির খাল খন কর্মসূচি শুরু হবে : শিগগির রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে একযোগে খাল খন কর্মসূচি শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে। খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন এবং এর নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। প্রেস সচিব বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ওনার জীবদ্দশায় এই কর্মসূচি নিয়ে বাংলাদেশে একটি মহাবিপ্লবে পরিণত করেছিলেন। তো দীর্ঘদিন থেকে আমরা দেশবাসী ভুক্তভোগী যে খাল খননও নেই এবং এই যে পানি জলাবদ্ধতা অথবা জলাশয়ে কোনো পানি নেই, সেচের ব্যবস্থা নেই সবকিছু থেকে দেশবাসী আমরা বঞ্চিত।’
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘এবার নির্বাচনী ইশতেহারে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগ থেকেই বারবার এই কথাটা উল্লেখ করেছেন এবং খাল খনন প্রক্রিয়াটাকে পুনঃখনের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে নিয়ে আসবেন, আমরা যেন দেশের মানুষ সুবিধাটা পাই।’ তিনি বলেন, ‘আজকে (গতকাল) আমরা মিটিং করেছি। সিদ্ধান্ত হয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়সহ এই চারটা মন্ত্রণালয় নিয়ে বসব। আলোচনা করব এবং পরবর্তী সপ্তাহে সিদ্ধান্ত হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা কীভাবে খাল খননের এই কর্মসূচি এবং বিপ্লব আকারে নিয়ে এটাকে সাকসেস করতে পারি, সেই সিদ্ধান্তে আমরা পৌঁছাব এবং আমাদের কার্যক্রম ১৮০ দিন যেটা, সেই কার্যক্রম আমাদের শুরু হবে।’
১৮০ দিনের মধ্যে কি এটা শুরু হবে এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা শুরু করব এবং ম্যাক্সিমামটা করার চেষ্টা করব ১৮০ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান করার। শুরু হবে শিগগির। এক সপ্তাহের মধ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কবে থেকে শুরু হবে।’
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক : বেলা ২টায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এক সভাকক্ষে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। ‘পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ এবং জাতীয় পর্যায়ে নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এই সভা হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানের বৈঠক : সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। এ সময় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.)।
এর আগে সকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি ও মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। এদিকে সচিবালয় অফিস শেষে প্রধানমন্ত্রী তার গুলশানের বাসভবনে পৌঁছান। সেখানে তিনি ইফতার করেন। অন্যদিকে তার মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান রাজধানীর ভাষাণটেক বস্তিতে বস্তিবাসীর সঙ্গে ইফতার করেন।