আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনা করবে সরকার

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৬ এএম

ভারতের আদানির সঙ্গে বাংলাদেশের অসম বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রতিবেদন দিয়েছে তা বর্তমান সরকার পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মো. খলিলুর রহমান, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম ও পর্যালোচনা কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে করে যাওয়া বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি খুঁজে বের করতে অন্তর্বর্তী সরকার একটি জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করেছিল। গত ২০ জানুয়ারি কমিটি সরকারের কাছে এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে আদানির সঙ্গে চুক্তি করতে আওয়ামী লীগ সরকার ভয়াবহ অনিয়ম করে বলে উল্লেখ করা হয়। এ কারণে এই চুক্তি বাতিল করা সম্ভব বলে মনে করে জাতীয় কমিটি। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি তারা নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেয়।

বৈঠক শেষে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের রিপোর্ট পর্যালোচনা করছি।’ আদানির সঙ্গে চুক্তি বাতিলের বিষয়ে কী ভাবছেন তা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘চাইলেই একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি বাতিল করা যায় না। সেখানে অনেক আইনি বিষয় থাকে। তবে আমরা দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কিছু মেনে নেব না।’

একই বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশের স্বার্থ সবার আগে। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

অধ্যাপক মোশতাক হোসেন বলেন, আশা করছি আমাদের সুপারিশ বাস্তবায়িত হবে।

প্রসঙ্গত, প্রতিবেদন নিয়ে গত ২৫ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে কমিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয় আদানির সঙ্গে যে চুক্তি করা হয়েছে তা বাতিলের জন্য শক্ত তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। পর্যালোচনা সংক্রান্ত কমিটি চুক্তি বাতিলে সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালতে যাওয়ার পরামর্শও দেয়।

কমিটির সদস্যরা বলেন, আদানির চুক্তির নেপথ্যে সাত-আটজন ব্যক্তির কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে অধিকতর তদন্তের জন্য তথ্য-উপাত্ত দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে।

পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে অসম চুক্তিতে বছরে ক্ষতি প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। দেশের বেসরকারি খাতের অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণেও বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এতে প্রতিবছর লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

আদানির সঙ্গে বিতর্কিত চুক্তি : ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে সই হওয়া ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তিটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিটি। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রতিবছর বাংলাদেশ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করছে।

পর্যালোচনা কমিটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভারত থেকে আমদানি করা অন্যান্য বিদ্যুতের চেয়ে আদানির বিদ্যুতের দাম প্রায় দ্বিগুণ। ভারতের গ্রিড থেকে যেখানে ৪ দশমিক ৪৬ সেন্টে বিদ্যুৎ পাওয়া যেত, সেখানে আদানিকে শুরুতে ৮ দশমিক ৬১ সেন্ট এবং পরে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্ট পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয়েছে।

কমিটির দাবি, এই চুক্তিতে বিদ্যুতের দাম স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি ধরা হয়েছে, যার ফলে ২৫ বছরে বাংলাদেশের অতিরিক্ত লোকসান হবে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত