পাপমুক্ত জীবনের প্রত্যয় রমজানে

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৬ এএম

মসজিদে নববির জুমার খুতবায় গত শুক্রবার শায়খ ড. সালাহ আল-বুদাইর মুসলমানদের রমজানের মর্যাদা, তাৎপর্য ও দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। রমজান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের মাস, যা ইবাদত, তওবা ও আত্মশুদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। মানুষ যেন এ মাস পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং মৃত্যুর আগে পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেয়। তিনি সতর্ক করেন, রমজানে দিনের বেলায় শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং জুলুম, প্রতারণা, আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা, নামাজে অবহেলা করা এবং অন্যের হক আত্মসাৎ করা থেকে বিরত থাকা, সর্বোপরি পাপমুক্ত জীবনযাপনে প্রত্যয়ী হওয়া সবার জন্য আবশ্যক এবং এ শিক্ষা বাকি এগারো মাসেও অব্যাহত রাখা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

শায়খ বলেন, হে মুসলমানগণ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং পরকালের সফরের আগে পাথেয় সংগ্রহ করো। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ (সুরা আলে ইমরান ১০২)

হে মুসলমানগণ! রমজান মাস আপনাদের মাঝে হাজির হয়েছে। এটি এক সুগন্ধিময় মাস, যা কল্যাণে ভরপুর। মহান আল্লাহর প্রশংসা করুন, তিনি আপনাদের এই মাস পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন, তিনি আপনাদের অবকাশ ও সক্ষমতা দিয়েছেন। কত মানুষ এই মাসে পৌঁছানোর আকাক্সক্ষা করেছিল, কিন্তু পারেনি। কতজন এটি পাওয়ার আশা করেছিল, কিন্তু পায়নি।

হে মুসলমানগণ! রমজানের চাঁদ উদিত হয়েছে, অথচ আমাদের কত প্রিয়জনকে আমরা হারিয়েছি, কত নিকটাত্মীয়কে আমরা কবরে শায়িত করেছি এবং কত সম্মানিত ব্যক্তিকে আমরা দাফন করেছি। ভাই-বন্ধু ও আপনজনদের চলে যাওয়া থেকে শিক্ষা নিন, তাদের চলে যাওয়া একটি উপদেশ, স্মরণিকা, শিক্ষা ও সতর্কবার্তা।

দ্রুত ফিরে আসুন তওবা করার সুযোগ হারানোর আগে, হোঁচট সামলানোর উপায় ফুরানোর আগে এবং সম্পদের বিনিময়ে নিজেকে মুক্ত করার পথ বন্ধ হওয়ার আগে। আপনাদের পক্ষ থেকে রমজানে আল্লাহর জন্য ইবাদত করুন। কারণ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মানুষ সফল হয় এবং সংকল্পের মাধ্যমেই মানুষ উত্তীর্ণ হয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) রমজানে ইবাদতে যতটা পরিশ্রম করতেন, অন্য কোনো মাসে তা করতেন না।

হে মুসলমানগণ! এটি কবুলিয়ত ও সৌভাগ্যের মাস। এটি মুক্তি ও বদান্যতার মাস। এটি আধ্যাত্মিক উন্নতির সময়। আপনি যদি নিষ্ঠাবান হোন, তবে এটিই প্রচেষ্টার সময়। আপনি যদি প্রস্তুত থাকেন, তবে এটিই ইবাদতের সময়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন রমজান আসে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

অপর আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, রমজানের প্রথম রাতে শয়তান ও অবাধ্য জিনদের শৃঙ্খলিত করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এর একটি দরজাও খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং এর একটি দরজাও বন্ধ করা হয় না। একজন আহ্বানকারী ডাকতে থাকেন, হে কল্যাণের অভিলাষী! এগিয়ে এসো, আর হে অকল্যাণের অন্বেষী! থেমে যাও। একদল লোক আল্লাহর পক্ষ থেকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পায় এবং তা প্রতি রাতেই ঘটে। (ইবনে মাজাহ)

হে পাপের কয়েদি! হে লাঞ্ছনার বন্দি! এটি এমন এক মাস, যাতে বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়, অপরাধীদের ক্ষমা করা হয় এবং অবাধ্যদের মাফ করা হয়। সুতরাং সুযোগ লুফে নিন এবং সময় ফুরিয়ে যাওয়াকে ভয় করুন। তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না, যারা সুযোগ পেয়েও তা প্রত্যাখ্যান করে এবং রমজান শেষ হয়ে গেলেও তাদের আশা পূরণ হয় না।

হে রোজা পালনকারী! পথের ধুলাবালি, আটার গুড়া বা লালা গিলে ফেললে রোজা ভাঙবে কিনা, আপনি তা নিয়ে প্রশ্ন করেন, আপনি এসব সামান্য বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেন, অথচ বড় বড় বিষয়ে অবহেলা করেন! কবিরা গুনাহ ও অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকুন। অপর ভাইয়ের সম্পদ ভক্ষণ, তার সম্মানহানি, প্রতারণা, জুলুম এবং তার সঙ্গে ছলচাতুরী করা থেকে বিরত থাকুন। সেই ব্যক্তি কি রোজা রেখেছে? যে রমজানের দিনে পানাহার থেকে বিরত থাকল, কিন্তু তার সন্তানদের তাদের তালাকপ্রাপ্তা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বাধা দিল, যার মমতা ও সান্নিধ্য ছাড়া তাদের জীবনে কোনো শান্তি নেই। সেই নারী কি রোজা রেখেছে? যে তার সন্তানদের তাদের পিতার সঙ্গে দেখা করতে বা তার কাছে যেতে বাধা দিল এবং তাদের অবাধ্যতা ও পাপাচারের উৎসাহ দিল। সেই ব্যক্তি কি রোজা রেখেছে? সেই ব্যক্তি কি রোজা রেখেছে? যে তার স্ত্রীকে ত্যাগ করল এবং তাকে মজলুম ও ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রাখল, যেখানে সে না হলো স্ত্রী, না হলো তালাকপ্রাপ্তা। সেই ব্যক্তি কি রোজা রেখেছে? যে তার পিতামাতার অবাধ্য হলো, তাদের ত্যাগ করল, তাদের ওপর বড়াই করল এবং তাদের সেবা করতে বিরক্তবোধ করল। সেই ব্যক্তি কি রোজা রেখেছে? যার কাছে কিছু চাওয়া হলে করলে কৃপণতা করে, যে কেবল কর্কশ ভাষায় উত্তর দেয়, ভয়ের মুখে না পড়লে কিছু দান করে না এবং সব কাজে টালবাহানা করে। সেই ব্যক্তি কি রোজা রেখেছে? যে ফরজ নামাজ বাদ দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে এবং নামাজকে তার সময় থেকে বের করে দেয়, জোহর ও আসরের নামাজ তার সময় পার হওয়ার পর আদায় করে এবং রমজানের পুরোটা সময় এভাবেই কাটায়। সেই ব্যক্তি কি রোজা রেখেছে? যে তার ভাই-বোনদের উত্তরাধিকারের সম্পদ আত্মসাৎ করে এবং দুর্বল, এতিম ও মিসকিনদের হক কেড়ে নেয়।

হ্যাঁ, সে রোজা রেখেছে। তার রোজা পালন হয়েছে এবং ফরজ দায়িত্ব আদায় হয়েছে বলে গণ্য হবে, কিন্তু এই রোজা মিথ্যা, পাপ ও জুলুমে আচ্ছন্ন। যা বড় বড় গুনাহের সঙ্গে মিশ্রিত। হতে পারে তার রোজার সওয়াব তার জুলুম ও অপরাধের পাল্লার সমান হবে না। সুতরাং যারা রোজা অবস্থায় পানাহার ও রোজা ভঙ্গকারী বিষয় থেকে বিরত রয়েছেন, তারা আল্লাহকে ভয় করুন এবং পাপ বর্জন করুন।

হে পানাহার বর্জনকারী! আফসোস, যদি আপনি জুলুম থেকে বিরত থাকতেন! রোজা কি কোনো উপকারে আসবে সেই জালেম ব্যক্তির জন্য, যার ভেতরটা পাপে পূর্ণ? আল্লাহ আমাকে ও আপনাদের তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা রমজানের রোজা রেখেছে, তা হেফাজত করেছে এবং নিজ আমল ও এহসানকে গুনাহ দ্বারা কলঙ্কিত করেনি। আমি যা বলছি তা আপনারা শুনছেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, আপনারাও ক্ষমা চান, নিশ্চয়ই তিনি তওবাকারীদের জন্য অত্যন্ত ক্ষমাশীল।

হে নিষিদ্ধ জিনিসের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপকারী! আপনারা বছরের শ্রেষ্ঠতম মাসে আছেন। সুতরাং সাবধান! এর পবিত্রতা নষ্ট করা, এর সম্মান ধূলিসাৎ করা এবং এর মর্যাদা ক্ষুণœ করা থেকে বিরত থাকুন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা এবং মন্দ কাজ বর্জন করল না, তার পানাহার বর্জন করাতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (সহিহ বুখারি)

জাবের বিন আবদুল্লাহ আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন তুমি রোজা রাখবে, তখন যেন তোমার কান, চোখ ও জিহ্বাও মিথ্যা ও হারাম থেকে রোজা রাখে। সেবককে কষ্ট দেওয়া বর্জন করো। তোমার রোজার দিনে তোমার মধ্যে গাম্ভীর্য ও প্রশান্তি থাকা উচিত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, অনেক রোজা পালনকারী এমন আছে, যাদের রোজার অর্জন কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছু নয় এবং অনেক রাত জাগরণকারী আছে, যাদের রাত জাগরণের অর্জন কেবল অনিদ্রা। (মুসনাদে আহমাদ)

পরকালের সুপারিশকারী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করুন। যে তার ওপর একবার দরুদ পড়বে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করবেন। হে আল্লাহ! আমাদের নবী ও সর্দার মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। খুলাফায়ে রাশেদীন, হেদায়েতপ্রাপ্ত ইমাম আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলী (রা.)-এর ওপর সন্তুষ্ট হোন। তার পরিবার, সাহাবি এবং আমাদের ওপরও সন্তুষ্ট হোন। হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলিমদের মর্যাদা বৃদ্ধি করুন। দ্বীনের শত্রুদের ধ্বংস করুন। আমাদের দেশ ও মুসলিম দেশগুলোকে চক্রান্তকারী, ষড়যন্ত্রকারী, বিদ্বেষী ও হিংসুকদের হাত থেকে রক্ষা করুন।

হে আল্লাহ! এই শহরকে নিরাপদ করুন। আমাদের রোগীদের সুস্থ করুন, বিপদগ্রস্তদের মুক্তি দিন এবং আমাদের মৃতদের ওপর রহম করুন। ফিলিস্তিনের আমাদের ভাইদের সাহায্য করুন। তাদের ভাঙন জোড়া দিন, তাদের বিজয় ত্বরান্বিত করুন, তাদের বিপদ দূর করুন, তাদের বন্দিদের মুক্ত করুন, তাদের অসুস্থদের সুস্থ করুন এবং তাদের মৃতদের শহীদ হিসেবে কবুল করুন।

হে আল্লাহ! আমাদের তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যাদের রোজা ও নামাজ আপনি কবুল করেছেন, যাদের ভুল-ত্রুটি ও পাপ মার্জনা করেছেন এবং যাদের অন্তর সংশোধন করেছেন। হে আল্লাহ! আমাদের দোয়া কবুল করুন। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক এবং সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।

২০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন

মুফতি আতিকুর রহমান

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত