ছয় সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক বিএনপির ৬ নেতা

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম

দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ করেছে সরকার। নতুন প্রশাসকদের সবাই ক্ষমতাসীন বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা। গতকাল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (সিটি করপোরেশন-১ শাখা) থেকে নতুন প্রশাসকদের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নতুন প্রশাসক হয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি এবং দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আবদুস সালাম। বিএনপির বর্ষীয়ান এই নেতা এক সময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র ছিলেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নতুন প্রশাসক হয়েছেন শফিকুল ইসলাম খান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তিনি। শফিকুল ইসলাম খান যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য-সচিব ছিলেন।

খুলনা সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ২০২১ সালের আগে তিনি ১৬ বছর খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ১২ বছর সভাপতি ছিলেন। সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। তবে এবার জিততে পারেননি তিনি।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার।

সিটি করপোরেশন হওয়ার আগে ১০ বছর তিনি কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান। ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপিদলীয় প্রার্থী ছিলেন তিনি। আলোচিত সাত খুনের মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন।

সিলেট সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব ছিলেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ছিলেন। তিনি বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য। তাছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তবে তিনি মনোনয়ন পাননি।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেশিরভাগ করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলররা গাঢাকা দেন। কেউ বা বিদেশে পাড়ি জমান। এই প্রেক্ষিতে তাদের বরখাস্ত করে প্রশাসক নিয়োগ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। অনেক জায়গায় প্রশাসক বেশ কয়েকবার পরিবর্তনও করা হয়। ক্ষমতায় যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রশাসক নিয়োগ করল সরকার। এর আগে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব নিয়েই যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনের কথা বলেছিলেন।

জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের প্রতিবাদ : ছয় সিটি করপোরেশনে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগে প্রতিবাদ জানিয়েছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা ছিল বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং গণহত্যার বিচার, প্রয়োজনীয় সংস্কার করা। এর প্রথম ধাপ হিসেবে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট হয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভোটের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে ছয়টি সিটি করপোরেশনে সরকারদলীয় পদধারীদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকার জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। এটি নৈতিকভাবে অত্যন্ত গর্হিত এবং জনগণের সঙ্গে সুস্পষ্ট প্রতারণা। এতে জনমনে গভীর সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে, সরকারের এ পদক্ষেপ স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এবং একই সঙ্গে আরেকটি পাতানো নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপ।

অপর এক বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সিটি করপোরেশনের মেয়ররা পালিয়ে গেলে সিটি করপোরেশনগুলো নেতৃত্বশূন্য হয়। আমরা তখন দাবি করেছিলাম যে, দ্রুত স্থানীয় সরকারের নির্বাচন আয়োজন করা হোক। কিন্তু বিএনপির বিরোধিতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা যায়নি। বরং সেখানে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে সিটি করপোরেশনগুলোয় দলীয় ব্যক্তিদের পুরস্কারস্বরূপ প্রশাসক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর মাধ্যমে দায়হীন ব্যক্তিদের কাছে দেশের সবচেয়ে বড় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুলে দেওয়া হলো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত