রাজবাড়ীতে শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০০ এএম

রাজবাড়ী বালিয়াকান্দি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. তাজমুন্নাহারের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, বিল অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, নিয়মিত অফিস না করা সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তার এই স্বেচ্ছাচারিতার জন্য শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাজমুন্নাহার। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বলা হচ্ছে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

শিক্ষকদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে স্লিপ ফান্ডের প্রায় ৩০ লাখ টাকার বিল অর্থবছর শেষ হওয়ার পরও আটকে ছিল এবং পরবর্তী অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে তা ছাড় করা হয়। বর্তমানে কন্টিনজেন্সি বিল, বই পরিবহন বিল, ইন্টারনেট বিল, পরিচ্ছন্নতা ব্যয় ও শান্তি বিনোদন ভাতাসহ একাধিক বিল তার স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।  

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক বলেন, নির্ধারিত সময়ে বিল না পাওয়ায় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে এবং ফাইল জমা দেওয়ার পর অনেক দিন ধরে ঘুরতে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দকৃত অর্থ সরাসরি বিদ্যালয়ের হিসাবে জমা হওয়ার কথা থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে বিলম্ব ঘটে এবং নথিপত্র অনুমোদনে অস্বাভাবিক সময় নেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী শিক্ষকদের সঙ্গে কথোপকথনের রেকর্ড দেশ রূপান্তরের হাতে রয়েছে। শিক্ষকদের বেতন সমতাকরণের জন্য শিক্ষকদের নিকট থেকে ৭৫ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তারা বলেন, ৪৩ জন শিক্ষকের কিছু বেতন বকেয়া ছিল। এই বেতন সমতাকরণের জন্য তারা শিক্ষা কর্মকর্তা তাজমুন্নাহারের কাছে কাগজপত্র জমা দেন। কিন্তু তিনি তাদের কাগজপত্রের ফাইল আটকে দেন। ফাইল আটকে যাওয়ার পরে তারা সবাই ১ হাজার করে টাকা দিতে চান। কিন্তু তিনি (শিক্ষা অফিসার) তাতে রাজি হননি। অবশেষে তাকে মোট ৭৫ হাজার টাকা দিলেও তাতে অখুশি ছিলেন কর্মকর্তা, যদিও আরও এক মাস অপেক্ষা করিয়ে তাদের ফাইলে স্বাক্ষর করলে বেতনের বিষয়টি সমাধান হয় বলে কয়েকজন শিক্ষক সরাসরি দেশ রূপান্তরের কাছে অভিযোগ করেছেন। 

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, মোছা. তাজমুন্নাহার গত ১০ মার্চ বালিয়াকান্দিতে যোগদান করেন। শিক্ষকদের অভিযোগ, সোমবার বিকেলে এসে বুধবার সকালে স্কুলে পরিদর্শনের কথা বলে অফিস ত্যাগ করেন। দেশ রূপান্তরের হাতে কয়েক সপ্তাহ শিক্ষা কর্মকর্তার আগমন-প্রস্থানের সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে।

গত জানুয়ারি মাসের রবিবার এবং বৃহস্পতিবার অফিস সময়ে খোঁজ নিয়ে তাকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। কোন কোন সপ্তাহের মঙ্গলবার তাকে অফিসে পাওয়া গেছে। সপ্তাহের সোমবার তিনি বেলা ২টার পর অফিসে এসেছেন। গত বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত অফিস করে কর্মস্থল ত্যাগ করেন এবং সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টায় অফিসে প্রবেশ করেন। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসগুলোতেও তার অনুপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি, গণঅভ্যুত্থান দিবসসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিবসে তাকে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত গণঅভ্যুত্থান দিবস এবং ২১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তাজমুন্নাহারকে দেখা যায়নি। দেশ রূপান্তর তার পূর্বের কর্মস্থলে আর্থিক বিষষয়াদি ও কর্মস্থলে উপস্থিতির তথ্য অনুসন্ধান করেছে। তাকে নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে রিপোর্টের কপিও সংগ্রহ করেছে দেশ রূপান্তর। 

প্রকাশিত রিপোর্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগে তিনি, শিবপুর, ধামরাই, নগরকান্দা উপজেলা-তে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়েন। শিবপুরে দায়িত্বে থাকাকালে ১৪২টি বিদ্যালয়ের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা তহবিল থেকে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েও ৬৫টি বিদ্যালয়ের ওয়াশব্লক প্রকল্পের ১৩ লাখ টাকা এবং ৩০টি ক্ষুদ্র মেরামত প্রকল্পের ৬০ লাখ টাকা বিলম্বিত রাখা হয়েছিল। শিক্ষকদের দাবি, ক্ষুদ্র মেরামতের বরাদ্দ থেকে ১০ হাজার টাকা, স্লিপ ও ওয়াশব্লক প্রকল্প থেকে ২ হাজার টাকা করে ঘুষ নিতেন। প্রধান শিক্ষকদের যাতায়াত বাবদ ২০০ টাকা করে নেওয়া হতো। 
শিক্ষকরা জানিয়েছেন, এই ঘুষ দিয়ে যেসব প্রধান শিক্ষক বিল অনুমোদন করাতেন, তাদের ছাড়া অন্যদের বিল আটকে রাখা হতো। নগরকান্দায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে ১০% কমিশন দাবির অভিযোগ তুলেছিলেন। ওয়াশব্লক নির্মাণের জন্য বরাদ্দকৃত ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ঠিকাদারের কাছ থেকে ১০% কমিশন দাবি করতেন। ঠিকাদার ৫% দিলে ফাইল স্বাক্ষরিত হতো না এবং বাকি ৫% পরিশোধের পরে স্বাক্ষর করানো হতো। এছাড়া ২৭ জন প্রধান শিক্ষকের বকেয়া টাইম স্কেল বা ভাতা উত্তোলনের সময় প্রতিজন শিক্ষকের কাছ থেকে ৭ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। শিক্ষকদের দাবি, এই অর্থ তার নিজস্ব একাউন্টে জমা হতো। অতিষ্ঠ হয়ে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন শিক্ষকরা। ঢাকার ধামরাই থেকে তাকে শাস্তিমূলক শিবপুর উপজেলায় বদলী করা হয়।  

পূর্ববর্তী কর্মস্থলে সরকারি কোয়ার্টারের ৩ লাখ টাকা বাসাভাড়া বকেয়া রেখে বদলি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান কর্মস্থলেও কোয়ার্টারের বাসা ভাড়া পরিশোধ না করার বিষয়টি এখন উপজেলায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন তিনি বাসা ভাড়া না দিয়ে এখান থেকেও বদলী হবেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. তাজমুন্নাহার বলেন, “আমার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়া বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগটি সঠিক নয়। পূর্বের কর্মস্থলে যদি আমার কোন অনিয়ম থাকতো তাহলে অবশ্যই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিতেন। এধরণের কোন কিছুই হয়নি।”

রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. তবিবুর রহমান বলেন, “শিক্ষা কর্মকর্তা তাজমুন্নাহারের শিক্ষকদের নিকট থেকে অর্থ নেওয়া, নিয়মিত অফিস না করার বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নয়। এ বিষয়ে আমাদের কাছে কেউ কোন অভিযোগ করেনি। এধরণে  কোন অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রাজা মুহম্মদ আব্দুল হাই দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের কোন গাফিলতি নেই। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। এছাড়া আমাদের কাছে কোন অভিযোগ আসলে সে বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমাদের পক্ষ থেকে আমরা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবো বলেও তিনি জানান। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত