বিদায় সফিউদ্দিন স্যার...

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৮ এএম

সিলেট এমসি কলেজে আমাদের বাংলা সাহিত্য পড়াইতেন ড. সফিউদ্দিন আহমদ। আমি আগাগোড়া ক্লাস বাং মারা ছাত্র হইলেও প্রায় প্রতিদিনই স্যারের অফিসে কিংবা বাসায় গিয়া বইসা থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মাথায় যে প্রশ্নই আসুক; বিনা দ্বিধায় কইরা বসতাম স্যারেরে; আর মগজের জট না খোলা পর্যন্ত তর্ক ছাইড়া দিবার অভ্যাস কোনোকালেও আছিল না আমার...

বছরের পর বছর আমার এই অত্যাচার সহ্য করছেন স্যারে। এক দিন এক প্রসঙ্গে কইলেন আধুনিক বিশ্বের স্থপতি কারা জানো?

লগে লগে আমি কিছু বিজ্ঞানীর নাম ঝাইড়া দিলাম। স্যারে কন না। আধুনিক বিশ্বের যৌথ স্থপতি হইলেন তিনজন; সিগমুন্ড ফ্রয়েড; কার্ল মার্ক্স আর চার্লস ডারউইন...

কইলাম কেমনে কী?

স্যারে কন মনস্তত্ত্ব¡ মানুষেরই মগজে জন্মানো কিংবা বিগড়ানো জিনিস; এই প্রমাণ দিয়া ফ্রয়েড মনুষ্যচিন্তায় ঐশ্বরিক কিংবা শয়তানিক সকল অলৌকিক প্রভাবের অস্তিত্ব বাতিল কইরা দিছেন...

মার্ক্স বোঝায়া দিছেন ধনী কিংবা গরিবির লগে কোনো অলৌকিক আশীর্বাদ-অভিশাপ কিংবা পাপপুণ্যের সম্পর্ক নাই; সকলই মানুষের কৌশলগত কারিগরি...

আর ডারউইন প্রমাণ কইরা দিছেন

কেউ আমাদের কিংবা অন্য কোনো প্রাণীরে বানায় নাই; আমরা সকলেই বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় বইনা উঠছি...

আধুনিকতার মূল বিষয়টা হইল অলৌকিকতা বর্জন; অলৌকিকতার মূল ভিত্তিটারেই ভাইঙা দিছেন এই তিনজন মানুষ...

যদ্দুর মনে পড়ে; সম্ভবত শুধু এই একটা যুক্তির পরে স্যারের লগে আমি আর কোনো তর্ক করি নাই

পাঠ্যপুস্তক বিবর্তনবিদ্যা নিয়া যারা কথা কন; এই সূত্র দিয়া নিজের আধুনিকতা মাইপা নিয়েন।

আমি ৮৯ সালে ক্লাস অ্যাগারোতে ভর্তি হইছিলাম সিলেট এমসি কলেজে। আমাদের পাঠ্য আছিল সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু; যেইটার কেন্দ্রীয় চরিত্র সাহিত্য প্রতিষ্ঠিত ভিলেন মজিদ। বার্ষিক পরীক্ষায় আমাগো বলা হইল মজিদের চরিত্র খোলাসা করতে...

তখন আমার মাথায় টাটকা মিল্টন-মধুসূদন। সিস্টেমমতে দুইখান পেপারে পাশ দিলেই অ্যাগারো থাইকা বারো ক্লাসে ওঠা যায়। তাই আমি ওই পরীক্ষায় পাশের চিন্তা ছাইড়া; দিলাম মজিদ চরিত্ররে ঘুরায়া। পুরা সময় বইসা ওই একটা প্রশ্নেরই উত্তর লেইখা মজিদরে বানায়া দিলাম লুসিফার-মেঘনাধ সমজাতের নায়ক। কয়দিন পরে এক পিওন আইসা আমারে খুঁইজা কয় বাংলা বিভাগের প্রধান আমারে তার অফিসে দেখা করতে কইছেন...

গেলাম। বিভাগীয় প্রধান সফিউদ্দিন আহমদ। কইলেন বসো। সেই যুগে শিক্ষকেরা কী জানি কী কারণে কোনোদিন ছাত্রগো বসতে কইতেন না; বেয়াদবের মতো দাঁড় করায়া কথা কইতেন। কিন্তু সফিউদ্দিন আহমদ আমারে তার সামনের চেয়ারে বসায়া কন তোমারে ডাকছি একটা অনুরোধ করতে। মাস্টরগো হাতে গরুপিটা খায়া ইস্কুল পার করছি আমি। শিক্ষক যে ছাত্ররে অনুরোধ করতে পারে এইটা আমার কাছে নতুন। আমি জিগাই কী স্যার?

তিনি কন ফাইনাল পরীক্ষাটা ফেইল কইরো না...

মেট্রিকের আগে মাস্টরেরা গোষ্ঠীবাইন্ধা আমারে পরীক্ষা ফেইলের অভিশাপ দিছে। এখন ইনি দেখি না ফেইলের অনুরোধ করেন। আমি হাঁ কইরা থাকি...

স্যার কন। তোমার খাতাটা আমি দেখছি; তুমি যা লিখছ তা স্বাধীন সাহিত্য বিশ্লেষণ। এই রকম যদি তুমি ফাইনাল পরীক্ষায় লেখো; তাইলে কিন্তু তোমারে ফেইল দিয়া দিবে। তোমারে অনুরোধ; পরীক্ষায় প্রথার বাইরে যাইও না।

সফিউদ্দিন স্যারের লগে আমার পরিচয়ের এই শুরু। প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য আমি পড়ি নাই; এমসি কলেজে পড়ছি এমএ পর্যন্ত। এই পুরাটা সময় স্যারের অফিস; স্যারের বাসা আছিল আমার এক নিয়মিত যাতায়াতের স্থান।

মলাট থাইকা মলাট পর্যন্ত পড়ারে সাহিত্য পড়া কয় না; সাহিত্য ঘুটাইতে হয়; সাহিত্য ঘুটাইতে গেলে জীবন-ইতিহাস-ভাষা-সংস্কৃতি ঘুটাইতে হয় নির্মোহ-নির্দয় তর্কে...

চর্যাপদ বাংলা না। স্যারের এই বিবৃতি ধইরা বছর দুয়েকের বেশি তর্ক করছিলাম আমি। সেই তর্কের রসদ জুগাইতে বাংলা ভাষার লাগাম ধরা আয়ত্ত হইছে আমার, আইজ শুনলাম স্যার মারা গেছেন।

আইজ আমিও কই চর্যাপদ বাংলা না। আর স্যারের দেওয়া বিশ্লেষণেই আমি আধুনিকতার সংজ্ঞা টানি আধুনিকতার ভিত্তি হইল অলৌকিকতা বর্জন... বিদায় স্যার...

লেখক, কবি ও কথাকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত