এখনো ক্রেতাশূন্য ইসলামপুর

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০১ এএম

পুরান ঢাকার ইসলামপুর থান কাপড় ও তৈরি পোশাকের বড় পাইকারি বাজার। সাধারণত পবিত্র ঈদুল ফিতর কেন্দ্র করে কয়েক মাস আগেই বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে থান কাপড় কিনতে শুরু করেন। পরে তারা নিজেদের কারখানায় সেই কাপড় দিয়ে তৈরি করা পোশাক খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোগল আমলে বাংলার সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতির নামানুসারে এই এলাকার নামকরণ হয় ইসলামপুর। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ১৭৭৩ সাল থেকে এখানে কাপড়ের পাইকারি ব্যবসা শুরু হয়। এর আগে ইসলামপুরে ফলের ব্যবসাই ছিল প্রধান। সেজন্য এলাকাটিকে আমপট্টি বলা হতো। এখন ইসলামপুরকে কাপড়ের ব্যবসার সবচেয়ে প্রাচীন কেন্দ্র মনে করা হয়।

ইসলামপুরে পাইকারি দরে শাড়ি, লুঙ্গি থেকে শুরু করে শার্ট-প্যান্ট, পায়জামা-পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন ধরনের তৈরি পোশাক প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয়। শবেবরাতের কয়েক দিন আগে এ বাজারে ঈদকেন্দ্রিক বেচাকেনা শুরু হয়। তবে জমে ওঠে রোজার প্রথম সপ্তাহেই। আর রোজার শেষদিকে আরেক দফা বেচাকেনা বাড়ে।

রোজার এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী পাইকারি কাপড়ের বাজার ইসলামপুরে এখনো জমে ওঠেনি বেচাকেনা। ক্রেতাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম থাকায় হতাশ ব্যবসায়ীরা। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ দোকানে পণ্য সাজিয়ে বসে থাকলেও কাক্সিক্ষত পরিমাণে অর্ডার মিলছে না। ব্যবসায়ীদের মতে, বাড়তি দামের চাপ, অনলাইন কেনাকাটার প্রসার এবং সার্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে পাইকারি বাজারে। ফলে মৌসুমের শুরুর দিকেই যে চাঙ্গাভাব দেখা যাওয়ার কথা তা এখনো অনুপস্থিত।

গতকাল বুধবার সরেজমিন ইসলামপুর পাইকারি কাপড়ের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন মার্কেটে থ্রি-পিস, শাড়ি, থান কাপড়, পাঞ্জাবির কাপড় ও শিশুদের পোশাকের বিশাল সমাহার রয়েছে। দোকানগুলো সাজানো নতুন ডিজাইনে ও রঙিন পোশাকে। কিন্তু ক্রেতাদের উপস্থিতি থাকলেও বড় অর্ডার কম।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, জেলার খুচরা ব্যবসায়ীরা এবার আগেভাগে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। অনেকে স্বল্প পরিমাণে পণ্য তুলছেন, আবার কেউ কেউ বাজার পরিস্থিতি বোঝার জন্য অপেক্ষা করছেন। ফলে পাইকারি বাজারে কাক্সিক্ষত গতি তৈরি হয়নি।

গুলশান আরা সিটি মার্কেট, জাহাঙ্গীর টাওয়ার এবং লায়ন টাওয়ার ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। দোকানগুলোতে পণ্যের ঘাটতি নেই, বরং স্টক অনেক বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অর্ডারের সংখ্যা কম হওয়ায় পণ্যের রোটেশন ধীর হয়ে গেছে। নতুন ডিজাইন আনতেও অনেকে সতর্ক। কেউ বলছেন, ক্রেতারা দাম আরও কমার অপেক্ষায় আছেন; আবার কেউ বলছেন, নির্বাচনের প্রভাবও বাজারে রয়েছে।

শিশুদের পোশাক ও থ্রি-পিসের বাজারেও ধীরগতি লক্ষ করা গেছে। শিশুদের থ্রি-পিস ৮০০ থেকে ২০০০ এবং পাইকারি বান্ডেল ৪৫০০ থেকে ১২০০০ টাকায় বিক্রি হলেও বিক্রি গত বছরের মতো হচ্ছে না বলে জানান বিক্রেতারা। সব থেকে চাহিদা চায়না কাপড়ের ৩০০ থেকে শুরু করে  ৮০০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতারা এখন খুব হিসাব করে পণ্য তুলছেন। আগে যেখানে একবারে বড় চালান নেওয়া হতো, এখন অনেকেই অল্প পরিমাণে নিচ্ছেন। ফলে পাইকারি বাজারের স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হচ্ছে না।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলারের দাম বাড়া, আমদানি খরচ ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে কাপড়ের দাম গত বছরের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক পাইকারি ক্রেতা দ্বিধায় পড়েছেন। তারা চাইছেন খুচরা বিক্রির গতি দেখে পরে বড় অর্ডার দিতে। ফলে বাজারে পণ্যের অভাব না থাকলেও বেচাকেনা আশানুরূপ নয়।

কাপড় ব্যবসায়ী শরীফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দোকানে লোক আসছে, কাপড় দেখে চলে যাচ্ছে। সে রকম অর্ডার দিচ্ছে না। যেমনটি আশা করেছিলাম, সে রকম বিক্রি নেই। জানি না সামনে কেমন বিক্রি হবে।’

গুলশান আরা সিটি মার্কেটের শরীফ এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার হাসান আলী বলেন, ‘বাজার খুব বেশি জমেনি। কিন্তু মেয়েদের থ্রি-পিস আর শাড়ির অর্ডার অন্য পণ্যের তুলনায় বেশি আসছে। জেলার দোকানদাররা প্রথমেই এগুলো তুলছেন, কারণ খুচরা বাজারে এগুলোর বিক্রি দ্রুত হয়। আশা করছি, সামনে বিক্রি আরও বাড়বে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত