সৃজনশীলতা ও নান্দনিক নকশার উন্মুক্ত প্রদর্শনী

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৩ এএম

অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশকদের ব্যস্ততা শুধু বিক্রির হিসাব-নিকাশে আটকে নেই। বইয়ের পাশাপাশি ভাবনা, নান্দনিকতা ও সৃজনশীলতারও এক নীরব প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে মেলাপ্রাঙ্গণ জুড়ে। অসংখ্য নতুন বইয়ের প্রচ্ছদ, নাম ও বিষয়বস্তুর ভিড়ে পাঠকের দৃষ্টি আটকে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রকাশকরা বইকে ঘিরে নির্মাণ করছেন আলাদা জগৎ। শৈল্পিক নকশা, ঐতিহ্যনির্ভর স্থাপত্যরীতি, রঙ-রূপ উঠে আসছে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনার মাধ্যমে। কোথাও বাঁশ-কাঠের স্টল, কোথাও কারুকার্যম-িত প্রবেশদ্বার, কোথাওবা দেয়াল জুড়ে হাতে লেখা শিরোনাম সব মিলিয়ে বইমেলা পরিণত হয়েছে নান্দনিক সৃজনশীলতার উন্মুক্ত প্রদর্শনীতে। পাঠকের মন জয়ের এ প্রয়াসে স্টলগুলো রূপ নিয়েছে সাহিত্য ও শিল্পের মিলিত আঙিনায়।

অসংখ্য নতুন বইয়ের ভিড়ে পাঠককে আকৃষ্ট করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক প্রকাশকের মতে, শৈল্পিক উপস্থাপনাই নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সৃজনশীল নকশা, চিন্তাশীল স্থাপত্য, প্রকাশনার স্বাতন্ত্র্য, সাহিত্যচরিত্র, বইমেলার ঐতিহ্য এবং বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি এসব উপাদান মিলিয়েই তৈরি করা হচ্ছে স্থায়ী ছাপ ফেলার আয়োজন।

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ভোরের শিশির নামে স্টলটি বাঁশ ও কাঠ দিয়ে নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। ভেতরে লেখকের জনপ্রিয় বইয়ের বড় বড় পোস্টার শোভা পাচ্ছে। পাশাপাশি পাঠকদের রিভিউ ব্যানার আকারে প্রদর্শন করা হয়েছে, যা সহজেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ভোরের শিশির প্রকাশনীর প্রকাশক রিয়াজউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের সর্বাধিক বিক্রিত বই একজন প্রচারবিমুখ ঔপন্যাসিকের, যিনি ‘ধ্রুপদী’ ছদ্মনামে লেখেন। প্রতিবছরই আমাদের স্টলে তার সৃজনশীল মেধার বিশেষ দিকগুলো তুলে ধরা হয়।’

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঝামাঝি স্থানে অয়ন প্রকাশনীর স্টলে রয়েছে সূক্ষ্ম কারুকাজে নির্মিত অলংকৃত প্রবেশদ্বার। স্টলের ভেতর-বাইরে এবং ছাদেও খোদাই করা হয়েছে পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক চরিত্র, সঙ্গে শৈল্পিক মোটিফ।

স্টলের বিক্রয়কর্মী তাহমিনা মমতাজ বলেন, ‘এসব খোদাই প্রকাশনীর নিজস্ব বইয়ের চরিত্র ও বিষয়বস্তুর অনুপ্রেরণায় তৈরি, যা সৃজনশীলতা ও শিল্পপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ।’

চৈতন্য প্রকাশনী ঐতিহ্যবাহী রূপ বেছে নিয়ে বাঁশ ও পাট দিয়ে স্টল সাজিয়েছে। এ স্টলের বিক্রয়কর্মী সৌরভ চৌধুরী বলেন, ‘বইমেলার শুরুর সময়ের আবহ থেকে এ ধারণা নেওয়া হয়েছে যখন গাছতলায় সাধারণ পাটের চট বিছিয়ে বই বিক্রি হতো। আমরা সেই নস্টালজিক (স্মৃতিকাতর) পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি।’

মাত্রা প্রকাশনী বাঁশশিল্পকে প্রাধান্য দিয়েছে। চিকন বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি দৃষ্টিনন্দন কাঠামোটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত। স্টল প্রতিনিধি খালিকুল জান্নাত বলেন, ‘এই নকশার মাধ্যমে দেশের সমৃদ্ধ স্থাপত্য ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।’

প্রতিকথা প্রকাশনীর স্টলের দেয়াল জুড়ে হাতে লেখা বইয়ের শিরোনাম বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে। স্টলের বিক্রয়কর্মী তাওসিফুর হাসান জানান, দূর থেকেই যেন দর্শনার্থীদের চোখে পড়ে। সে ভাবনা থেকেই তিনি নিজ হাতে শিরোনামগুলো লিখেছেন।

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে দৃষ্টি কাড়ছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি টেরাকোটা রঙের স্থাপনা। এতে টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক আতিয়া মসজিদের স্থাপত্যরূপ পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতœবস্তুর প্রতিরূপ নিয়ে গ্রাফিতি ও হস্তশিল্প প্রদর্শিত হচ্ছে। অধিদপ্তরের গ্রন্থাগারিক জানান, পাঠকদের মধ্যে প্রতœতত্ত্ব বিষয়ে আগ্রহ সৃষ্টি এবং দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।

বাংলা একাডেমি মাঠে একটি আমগাছের নিচে উদীচীর স্টলও আলাদা বার্তা দিচ্ছে। সম্প্রতি একটি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর হামলার শিকার হওয়া এ সাংস্কৃতিক সংগঠনটি পোড়া শিল্পকর্ম ও সাহিত্যসামগ্রী প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থার প্রতীকী উপস্থাপনা করেছে।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের স্টলে রয়েছে জুলাই মাসের সাময়িকী, আলোকচিত্র ও শহীদদের স্মরণে সংরক্ষিত নানা স্মারক।

মেলা জুড়ে আরও অনেক স্টলে দেখা যাচ্ছে শৈল্পিক স্থাপনা ও বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও নিজস্ব ভাবনায় সাজিয়েছে তাদের স্টল। সব মিলিয়ে বইমেলা শুধু বই নয়, সৃজনশীলতা ও নান্দনিক প্রকাশও এখন পাঠকদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির আরও কাছাকাছি টেনে আনার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

পঞ্চম দিনে নতুন বই এসেছে ৪০টি : গতকাল ছিল অমর একুশে বইমেলার পঞ্চম দিন। এ দিন মেলা দুপুর ২টায় শুরু হয়ে রাত ৯টায় শেষ হয়। গতকাল তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ৪০টি। এ নিয়ে মেলার পাঁচ দিনে নতুন বইয়ের সংখ্যা ১৩৬।

বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘সার্ধশত জন্মবর্ষ : শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হামীম কামরুল হক। আলোচনায় অংশ নেন পারভেজ হোসেন। সভাপতিত্ব করেন সফিকুন্নবী সামাদী।

হামীম কামরুল হক বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যের এক কীর্তিস্তম্ভের নাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার উপন্যাসগুলোর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নারী জীবনের মুক্তি ও বৃহত্তর সমাজের কল্যাণ সাধন। দেশি-বিদেশি সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ বহু বিষয়ে তিনি নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। পড়াশোনার মাধ্যমেই ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব, সমাজ ও দর্শনের হালনাগাদ খবর রাখতেন। শরৎচন্দ্রের চেতনায় একটি ভক্তিবাদী বিদ্রোহ ছিল; তিনি উচ্চবর্ণ বা উচ্চশ্রেণির চাপিয়ে দেওয়া অনেক কিছুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন।’

‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী ও এজাজ ইউসুফী। বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন শাহনাজ পারভীন লিপি, শামীমা চৌধুরী, রোকসানা আক্তার এবং ঝর্ণা আলমগীর। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী শিমু দে, অণিমা রায়, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, পাপড়ি বড়ুয়া, ফারাহ হাসান মৌটুসী ও খোকন চন্দ্র দাস।

আজকের সময়সূচি : আজ মঙ্গলবার অমর একুশে বইমেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।

বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘জন্মশতবর্ষ : তাজউদ্দীন আহমদ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মহিউদ্দিন আহমদ। আলোচনায় অংশ নেবেন সাজ্জাদ সিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। বিকেল ৪টায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত