ইরানের ভবিষ্যৎ এখন বিপ্লবী গার্ডদের হাতে!

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:৩৬ এএম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দেশটিতে সবচেয়ে বড় ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। খামেনির দায়িত্ব পালনের জন্য একটি অস্থায়ী পরিষদ গঠন করা হয়েছে। কিন্তু ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আসল ক্ষমতা এখন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) হাতে।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস- যাদেরকে সাধারণত বিপ্লবী গার্ড বলা হয়-ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী থেকে আলাদা একটি শক্তিশালী সংগঠন। তারা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সামরিক নীতি নির্ধারণ, নিজস্ব মিসাইল ও নৌবাহিনী, গুরুত্বপূর্ণ সাইবার অপারেশনসহ নির্মাণ খাত ও অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে তাদের শক্তিশালী ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার মাধ্যমে। তারা পরিবহন কেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করে এবং জ্বালানি খাতে বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ইরানি তেলের ক্রেতাদের জন্য তারা মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।

খামেনি বিপ্লবী গার্ডদের সঙ্গে পরস্পরের স্বার্থসিদ্ধির সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে তাদের ওপর নির্ভর করতেন এবং তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করতেন। এখন তার মৃত্যুর পর গার্ডরা শুধু পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবে তা নির্ধারণ করবে না, বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে থাকবে কি না এবং তার ভবিষ্যৎ রূপ কী হবে- সেটাও তারাই ঠিক করবে।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস কী?

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, বিশেষ করে পারমাণবিক ও মিসাইল কর্মসূচির কারণে এবং ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে কঠোর হয়ে ওঠার ফলে বিপ্লবী গার্ডরা একটি সাধারণ সামরিক শাখা থেকে বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিপ্লব ও বিপ্লবোত্তর ব্যবস্থাকে রক্ষা করার জন্য গঠিত এ সংগঠন এখন অনেক বড় হয়ে উঠেছে।

গার্ডরা একক সত্তা নয়। এদের মধ্যে কিছু অংশ অত্যন্ত সামরিকবাদী ও আদর্শবাদী- যারা মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা যাবে না। আবার কিছু অংশ বাস্তববাদী যারা গার্ডদের বিশেষ সুবিধা বজায় রাখার জন্য যেকোনো কিছু বিবেচনা করতে রাজি।

মার্কিন মূল্যায়ন অনুযায়ী, গার্ডদের সক্রিয় সেনা প্রায় ২ লাখ এবং আরও ৬ লাখ স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে যার মধ্যে বাসিজ প্যারামিলিটারি মিলিশিয়া অন্যতম। কিন্তু এ সংখ্যা তাদের প্রভাবের পুরো চিত্র তুলে ধরে না। সাবেক সদস্যরা ইরানি সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রে ছড়িয়ে রয়েছে।

গার্ডরা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা রাখে- তারা সর্বত্র উপস্থিত, সশস্ত্র ও ভালো অর্থায়িত। কিন্তু ব্যবস্থা যদি ভেঙে পড়ে তাহলে তাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে।

ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে কে আসতে পারে?

বিপ্লবী গার্ডদের বর্তমান ও সাবেক সদস্যদের মধ্যে শক্তিশালী নেতাদের অভাব নেই। তারা ইরানের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সামরিক অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ব্যালিস্টিক মিসাইল, ড্রোন থেকে শুরু করে পারমাণবিক কর্মসূচি। অনেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদেও রয়েছেন, যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি।

অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ-বাকের গালিবাফ। খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির কোনো খবর নেই, যিনি সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হন।

একজন শক্তিশালী নেতা বা তাদের সম্মিলিত নেতৃত্ব ক্ষমতা দখল করতে পারে এবং পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতার ভূমিকা দুর্বল করে দিতে পারে। অস্থিরতা এড়াতে নতুন নেতৃত্বকে জনগণের অভিযোগ মোকাবিলা করতে হবে বিশেষ করে ৪০ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি ও গত এক বছরে মুদ্রার অর্ধেকের বেশি মূল্যহ্রাস।

উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া কেমন?

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি এই তিনজনের অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করছে। পরবর্তী নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব বিশেষজ্ঞদের পরিষদের (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) ওপর। এ পরিষদের সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন তবে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের (অনির্বাচিত) যাচাই-বাছাইয়ের পর। পরিষদ কবে বৈঠক করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

খামেনির মৃত্যুর খবর দ্রুত প্রকাশের কারণ হয়তো লুকানো অসম্ভব ছিল অথবা পেছনের দরজায় উত্তরসূরি ঠিক হয়ে গেছে বলে মনে করেন কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহরান কামরাভা।

দেশের বাইরে থেকে কেউ নেতা হতে পারে?

বহিরাগত বিরোধী নেতারা খুব কম এবং বিভক্ত। দেশের ভেতর থেকে জনগণের আন্দোলন গড়ে তোলার সব চেষ্টা সরকার দমন করেছে। নির্বাসিত কেউ ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা খুব কম বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভি সাম্প্রতিক বিক্ষোভে কিছু মানুষের জন্য প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন এবং জানুয়ারির শুরুতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু ইরানের ভেতরে তিনি বিতর্কিত কারণ অনেকে তাকে পুরনো রাজতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত মনে করেন এবং প্রশ্ন তোলেন যে তার ফিরে আসা সত্যিকারের পরিবর্তন আনবে কি না। বিদেশি সমর্থন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের, তার বৈধতা বাড়াতে পারে- অথবা বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ আরও জোরালো করতে পারে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি বলেছেন, শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দলগুলো ক্ষমতা নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং তারা আরও কঠোর হতে পারে।

বিপ্লবী গার্ডরা কি সরাসরি শাসন করতে চাইবে?

লেবাননের হিজবুল্লাহকে সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে আনুষ্ঠানিক শাসক দলে রূপান্তরিত হতে দেখে গার্ডরা হয়তো সরাসরি শাসনের দায়িত্ব নিতে চাইবে না।

শাসন করলে ইরানের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সংকটের দায়িত্ব তাদের ওপর আসবে—কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা তারা এড়াতে চায়। এখন তারা ছায়া থেকে প্রভাব বিস্তার করে এবং বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

জানা যায়, গার্ডরা ধর্মীয় সংস্থা নয়। তারা নারীদের ওপর বিধিনিষেধ শিথিলের মতো সীমিত সামাজিক সংস্কার বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু এর বিনিময়ে নাগরিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা আরও সীমিত হতে পারে বিক্ষোভে কম সহিষ্ণুতা, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ জোরদার ও বিরোধিতার জন্য কঠোর শাস্তি। বিদেশে তারা আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে।

সূত্র: ব্লুমবার্গ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত