ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের দিকে নজর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ জব্দ করতে দেশটিতে বিশেষ বাহিনী (স্পেশাল ফোর্স) পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা করছে ওই দুই দেশ। তবে এ বিশেষ অভিযানে শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল অংশ নেবে, নাকি এটি একটি যৌথ অভিযান হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মিশনটি সম্ভবত হামলার ‘পরবর্তী ধাপে’ বাস্তবায়িত হবে। দুই দেশ যখন নিশ্চিত হবে যে ইরানের সামরিক বাহিনীর আর কোনো জোরালো প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার সক্ষমতা থাকবে না, তখনই এ কমান্ডো অভিযান চালানো হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ যুদ্ধে ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। বর্তমানে ইরানের কাছে ৪৫০ কেজি ‘৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ’ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বিশাল মজুদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে তাদের পরমাণু কর্মসূচি বেসামরিক লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েল কেউই নিজেদের এ দাবির সপক্ষে কখনোই কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। ফলে ইরানের সঙ্গে বারবার সংঘাতে জড়িয়েছে এ দুই দেশ। পারমাণবিক অস্ত্রের ‘অজুহাত’ দেখিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ নানা কঠোর পদক্ষেপ ইরানের অর্থনীতিও ধসিয়ে দিয়েছে।
গত বছর জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও অবকাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল একযোগে হামলা চালিয়েছিল। সেই হামলার পর দেশটির ইউরেনিয়াম মজুদের বর্তমান অবস্থা ঠিক কী, তা এখনো অস্পষ্ট।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, বোমা হামলার শিকার হওয়া ওই স্থানগুলোয় ইরান তাদের পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। তবে সংস্থাটি এটিও জানিয়েছে, তাদের পরিদর্শকরা এখন পর্যন্ত ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো সমন্বিত কর্মসূচির প্রমাণ পায়নি। আইএইএর পরিদর্শকরা সর্বশেষ গত বছর ১০ জুন এই ইউরেনিয়াম দেখেছিলেন।
পারমাণবিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধতা বা ‘ওয়েপন-গ্রেড’ পর্যায়ে পৌঁছানোর খুব কাছাকাছি একটি ধাপ।
তীব্র হামলা ইরানে : ইরানের রাজধানী তেহরান ও আশপাশের পাঁচটি তেল-সংক্রান্ত স্থাপনায় গতকাল রবিবারও তীব্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এতে চারজন নিহত হয়েছেন।
ইরানি তেলজাত পণ্য বিতরণ সংস্থার প্রধান নির্বাহী কেরামত ভেইস্কারামি জানিয়েছেন, তেহরান ও আলবোরজে চারটি তেল ডিপো এবং একটি পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন কেন্দ্রে শত্রুপক্ষ বিমান হামলা চালিয়েছে। ভেইস্কারামি বলেন, ইরানের তেল ডিপোগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণে জ্বালানি মজুদ আছে।
প্রতিবেশী দেশে হামলা অব্যাহত : ইরান প্রতিবেশী আরব দেশগুলোয় হামলা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও গতকাল এমন কিছু হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত শনিবার এমন হামলা বন্ধের কথা বলেছেন। তবে কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির তিন সদস্যবিশিষ্ট শাসন-তদারকি কমিটির অন্য দুই সদস্য বিচার বিভাগের প্রধান ও কট্টরপন্থি ইসলামি ধর্মগুরুদের প্রতিনিধি প্রেসিডেন্টের এমন অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন। এতে করে ইরানের পাল্টা হামলাও অব্যাহত আছে।
গতকালও বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত জানা যায়নি। কুয়েতে ইরানের হামলায় দুজন সীমান্তরক্ষী নিহত হয়েছেন। গতকাল ভোরে চালানো এ হামলায় কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংকসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে দ্বিতীয় দফায় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের বাহিনী রিয়াদের আকাশে তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
নরওয়ের রাজধানী অসলোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কাছে শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে ঠিক কী কারণে এ বিস্ফোরণ ঘটেছে বা এর পেছনে কারা জড়িত থাকতে পারে সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি পুলিশ।
এদিকে পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ২০০ জনের বেশি সদস্য নিহত বা আহত হয়েছে বলে দাবি ইরানের। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী সমন্বিত কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া’র সদর দপ্তরের মুখপাত্র ক্ষয়ক্ষতির এ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের ‘ট্রু প্রমিজ ৪’ অভিযানের অধীনে চালানো এসব হামলায় এ অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো ও সম্পদের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ওই মুখপাত্রের দাবি অনুযায়ী, বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরে চালানো হামলায় ২১ সেনা নিহত ও আরও অনেকে আহত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে আল ধাফরা বিমানঘাঁটিতে চালানো হামলায় ২০০ সেনা নিহত হয়েছে। আর পারস্য উপসাগরের উত্তরাংশে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি তেল ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে।
ইরান ছয় মাস তীব্র যুদ্ধ চালাতে সক্ষম : টানা নয় দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিরবচ্ছিন্ন হামলার মধ্যেই ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, আরও ছয় মাস পর্যন্ত তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম ইরান। গতকাল ফার্স নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাঈনি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমান গতিতে পরিচালিত সামরিক অভিযানের মতো তীব্র যুদ্ধ অন্তত আরও ছয় মাস চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে।
চীনের সতর্কতা : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার মধ্যে ইরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করলে তা জনগণের সমর্থন পাবে না এমনটা মনে করে চীন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বেইজিংয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বেইজিংয়ের প্রধান অবস্থান হলো ইরানসহ সব দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করা উচিত। সংঘাত বাড়লে তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চীনের মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষরাই অঞ্চলের প্রকৃত মালিক। তাই বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া আঞ্চলিক দেশগুলোরই নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা উচিত।
সৌদি আরবে নিহত এক বাংলাদেশি : সৌদি আরবে একটি আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কমপক্ষে দুজন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন ১২ জন। নিহতদের একজন বাংলাদেশি অন্যজন ভারতীয়। সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটের একটি কমপাউন্ডের ওই ভবনে ওই হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি গেজেটের এক খবরে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স এজেন্সিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সএ এক পোস্টে এসব বিষয়টি জানিয়েছে। এর আগে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছিল, তারা সৌদি আরবের আল খার্জসহ বিভিন্ন স্থানের রাডার ব্যবস্থা নিশানা করে হামলা চালিয়েছে। সেই আল–খার্জে দুজন নিহত হওয়ার কথা জানা গেল।
ইরানে হামলায় সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম : ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালেও তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই সামান্য। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক অত্যন্ত গোপনীয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই কথা জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের (এনআইসি) তৈরি করা এই শ্রেণিবদ্ধ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ইরানে বড় আকারের সামরিক হামলা চালানো হলেও তার মাধ্যমে সেখানকার ধর্মতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাবনা খুবই কম। এমনকি যদি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকেও হত্যা করা হয়, তবু দেশটির সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব বিদ্যমান উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হতে পারে।
১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত মতামতের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন তৈরি করা হয়েছে। তবে এই মূল্যায়নটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, তিনি চাইলে ইরানের নেতৃত্বকে ‘সরিয়ে’ নিজের পছন্দের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে। এতে সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয় যেমন সীমিত হামলা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বড় ধরনের আক্রমণ হলে কী ঘটতে পারে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো আরও বলেছে ইরানের বিভক্ত বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা দখল করতে পারবে, এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
