ভোটের আগে নারীদের কতই না শ্রদ্ধা-ভালোবাসা। নির্বাচন ঘিরে নারীর ভোটের জন্য নানা স্বপ্ন দেখায় রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু নির্বাচনের পর সে অবস্থা দৃশ্যত বদলে যাচ্ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। এমন নৃশংস ঘটনায় উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠন। সরকারের তরফ থেকেও বলা হচ্ছে, নারী নির্যাতনে জিরো টলারেন্স নীতি তাদের। এমন ঘটনায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ভোটের আগে নারীদের ‘সম্মান ও মর্যাদা’ রক্ষার বুলি যারা বেশি আউড়েছেন, নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এখন তাদের অনেকেই চুপ হয়ে গেছেন। তারা বলছেন, নারী নির্যাতন থামাতে, নারীদের মর্যাদার আসনে বসাতে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন দাঁড় করাতে হবে। নতুন সরকারকে বিগত দিনের বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে ঘটনাগুলো ঘটছে, এ প্রসঙ্গে আমরা বলতেই পারি, এটা পূর্ববর্তী ১৮ বছরের ধারাবাহিকতার ফল। আইন না মানা, আইনের শাসন না থাকা, যথাযথ বিচার না হওয়া এসব কিছুরই সমষ্টিগত ফল এ ঘটনাগুলো। তাই তুলনামূলক বিশ্লেষণে না গিয়ে সমাধানের পথে হাঁটতে হবে। কীভাবে দ্রুততম সময়ে এসব ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।’
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশে ২৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৫ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ১০ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং তিনজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ৯০ জন নারী ও কন্যাশিশু, এর মধ্যে শিশু ১১ জন। পারিবারিক সহিংসতায় ৪১ জন নিহত, ২৬ জন আহত ও ৩০ জন আত্মহত্যা করেছে। যৌতুকের জন্য একজন নারী নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া অ্যাসিড হামলায় নিহত হয়েছেন একজন নারী। উল্লেখযোগ্যভাবে, ৯৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ৫১ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
মানবাধিকার-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সম্প্রতি দেশে কয়েকটি ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী ঘটনা নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম যখন সামনে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কোথাও কি রাজনৈতিক মদদ কাজ করছে, নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে? অপরাধ দমনে নিরপেক্ষতা ও বিচার নিশ্চিত না হলে দোষীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। আর তখন সমাজে অপরাধ বেড়ে চলে।
দলমত-নির্বিশেষে নারীর প্রতি সহিংসতার বিচার হওয়া উচিত বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা আখতার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় কোনো রাজনৈতিক দল উদ্বেগ ও প্রতিবাদ দিয়েছে বা কেউ দেয়নি এ নিয়ে কথা বলতে চাই না। নারীর নিরাপত্তায় সবার এগিয়ে আসা উচিত। আইনের চোখে সবাই সমান। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় আনতে হবে।
এ ছাড়া একাধিক নারী নেত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, নারী ও শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্র আইন ও নীতিমালা গ্রহণ করেছে, তবে বাস্তব প্রয়োগে অনেক সময় সেসবের ঘাটতি লক্ষ করা যায়। সামাজিক সচেতনতাও কিছু বেড়েছে, অভিযোগ জানানোর প্রবণতাও আগের তুলনায় দৃশ্যমান; তবু ভুক্তভোগীরা এখনো ভয়, লজ্জা ও প্রভাবের চাপে ন্যায়বিচার থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হন।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা জানিয়ে তারা আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত, ভিকটিমবান্ধব বিচার প্রক্রিয়া, সাক্ষী সুরক্ষা এবং পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে লিঙ্গসমতা ও সহিংসতাবিরোধী সচেতনতা জোরদার করতে হবে। নিরাপদ সমাজ গড়তে রাষ্ট্র ও সমাজকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে।
সম্প্রতি নারীর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা : গত ৪ মার্চ কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে তার নিজ কক্ষে ঢুকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুন করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারী। এর আগে গত ১ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক এলাকায় দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদীতে দুটি আলাদা স্থান থেকে দাদি (৬৫) ও নাতনির (১৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বাড়ি থেকে দাদির এবং পাশের সরিষাক্ষেত থেকে নাতনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, ধর্ষণের পর নাতনিকে হত্যা করা হয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীতে এক কিশোরীকে হত্যা করা হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম উলন এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের লিফটের ফাঁকা জায়গায় জমে থাকা পানি থেকে তাহেদী আক্তার (৬) নামের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
উদ্বেগ ও প্রতিবাদেই দায় শেষ : নারীর প্রতি এমন নির্যাতন ও সহিংসতায় শুধুই রাজনৈতিক দলগুলোর কাগুজে উদ্বেগ ও প্রতিবাদ আর ক্যাম্পাসগুলোয় মানববন্ধনেই শেষ হয়ে যায়। সম্প্রতি নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বিএনপি ছাড়া অন্য সবাই উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো ঘটনার প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানালেই সব শেষ হয়ে যায় না। ঘটনা ঘটলে কত দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার ও বিচার করা হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নারী নির্যাতনে জিরো টলারেন্স নীতির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সুষ্ঠু তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তারে নির্দেশনা রয়েছে। তদন্তে গাফিলতি দেখা দিলে পুলিশের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
নারী নির্যাতনের প্রতিটি বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি দিলেও এর বিহিতে তাদের কোনো অবস্থান আছে কি জানতে চাইলে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেও কিছু জানা যায়নি। অবশ্য, তবে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনাগুলোর দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে।
অবশ্য, জামায়াতে ইসলামীর নারী শাখা বলছে নারীদের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং এই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার দায় সরকার ও প্রশাসনকে বহন করতে হবে।
নারীকেন্দ্রিক সংগঠনগুলো যা বলছে : জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরাম (জেএনএনপিএফ) ও দুর্বার নেটওয়ার্ক এক বিবৃতিতে জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও কিশোরীদের ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু আইন ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থাকা সত্ত্বেও এসব অপরাধের বিচার দ্রুত ও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শুধু নিন্দা জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেছেন, নতুন সরকার ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলেও সেখানে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের কোনো কর্মসূচি নেই। নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলে, শূন্য সহিংসতার নীতি অনুসরণ করে অবিলম্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে একটা টাস্কফোর্স ঘোষণার দাবি জানিয়ে বলেন, দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার বিচার না হওয়ার পুরনো সংস্কৃতি চলছে। এই সংস্কৃতি দেশকে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
