পাড়া মহল্লার গলিতে বা মাঠে ক্রিকেট খেলা হলে অলিখিত শর্ত থাকে, মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই খেলা শেষ। পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ৩ ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটিও যেন সেই নিয়মই মানল! মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা আজানের সুললিত ধ্বনিতে যখন রোজাদাররা ইফতার করছেন, ঠিক তখন খেলাও শেষ মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। পাকিস্তানকে ১১৪ রানে অলআউট করে দেওয়ার পর ১৫.১ ওভারেই ১১৫ রান করে ফেলেছে বাংলাদেশ। ৫০ দুগুণে ১০০ ওভারের ম্যাচের স্থায়িত্ব দুই ইনিংস মিলিয়ে মাত্র ৪৬ ওভার।
টস জিতলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। বেছে নিলেন বোলিং। একাদশে এসেছেন নাহিদ রানা, দেশের মাটিতে এবারই প্রথম কোনো ওয়ানডেতে সুযোগ পেয়েছেন এই স্পিডস্টার। সৌম্য সরকার নেই, তার বদলে সুযোগ পেয়েছেন তানজিদ হাসান তামিম। ভালো দিক যে নাম এবং কথিত প্রতিভার প্রেমে মজে প্রায় মাস পাঁচেক আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৯১ রান করা সৌম্যকে একাদশে রাখা হয়নি, বরং দিনকয়েক আগে বিসিএল অলস্টারদের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করা তানজিদ তামিমকে ফেরানো হয়েছে ইনিংসের সূচনায়। গত বছর আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের পর ফের দলে একাদশে তানজিদ তামিম, এই নিয়ে মিরপুরে মাত্র ৪র্থ ওয়ানডে খেলছেন ২৩’র আগস্টে অভিষেকের পর।
পাকিস্তান একাদশে সুযোগ দেয় চার অভিষিক্তকে। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান সাহেবজাদা ফারহান ও মাজ সাদাকাত, ওয়ানডাউনে শামিল হোসেন ও মিডল অর্ডারে আবদুল সামাদ। তিনজনের জন্যই দিনটা হতাশার। পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের শুরুটা ছিল অতিরিক্ত সাবধানী। সাহেবজাদা ফারহান কিছুদিন আগেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যে রানবন্যা বইয়ে এসেছেন, সেটা তার ব্যাটিং দেখে মনেই হয়নি। বরং মনে হচ্ছিল ফারহান ও সাদাকাত মিলে রঙিন জার্সিতে টেস্ট খেলতে নেমেছেন। পাওয়ার প্লের শেষ বলে উইকেট পেলেন নাহিদ রানা। এক বল আগেই বাউন্ডারি মেরেছিলেন ফারহান, পরের বলটা একটুর জন্য ব্যাটের কানায় লাগেনি। ওভারের শেষ বলটায় বাউন্ডারি মারতেই বোধহয় প্রলুব্ধ হয়েছিলেন ফারহান, কাট করতে গিয়ে সোজা পাঠিয়ে দিলেন আফিফ হোসেনের হাতে। ৪১ রানে প্রথম উইকেটের পতন, সেখান থেকে ১১৪ রানে অলআউট। এই ব্যাটিং ধসের মূল কারিগর নাহিদ রানা। পাকিস্তানের ইনিংসের প্রথম ৫ উইকেটই তার। ফারহানের পর শামিলও ক্যাচ দিলেন উইকেটের পেছনে, লিটন দাসের হাতে। তানজিদ তামিম ক্যাচ ছেড়ে জীবন দিয়েছিলেন অভিষিক্ত শামিলকে, তারপরও ৪ রানের বেশি করা হলো না তার। নাহিদের পরের শিকার মাজ সাদাকাত, গতিতে পরাস্ত হয়ে ক্যাচ দেন সাইফ হাসানের হাতে। এরপর মোহাম্মদ রিজওয়ান, নাহিদের গতির সামনে পা জোড়া যেন থমকে গিয়েছিল। ব্যাট নাড়ানোরও সময় পাননি, বল তার ব্যাটের কানা ছুঁয়ে চলে যায় লিটনের হাতে। শর্ট বলে পরাস্ত হয়ে সালমান আলি আগাও উইকেট দিয়েছেন নাহিদ রানাকে। ৪.৫ ওভারে ১৮ রান খরচায় ৫ উইকেট নিয়ে নেন নাহিদ রানা, পাকিস্তানের রান তখন ৬৯।
নাহিদের শিকারে ভাগ বসাতে চলে আসেন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজও। অভিষিক্ত সামাদ ঝুঁকে ডিফেন্স করতে গিয়ে বল লাগান ব্যাটের কানায়, মাঠের আম্পায়ার আউট দিলে সেটার প্রতিবাদে রিভিউ চেয়ে বসেন। কিন্তু প্রযুক্তি তাকে বানিয়ে দেয় মিথ্যাবাদী, ব্যাটের কানায় বল লাগলে ব্যাটসম্যান সেটা টের পাবেন না এমনটা হয় না। অভিষেকে শূন্য রানে আউট হওয়ার লজ্জা কাটাতেই হয়তো তার এই অপচেষ্টা, তবে সেটা গেছে বিফলেই। এরপর হুসাইন তালাতকে এলবিডাব্লিউর ফাঁদে ফেলেন মিরাজ, মাঠের আম্পায়ার আউট না দিলেও এইবার রিভিউ নিয়ে সফল বাংলাদেশ অধিনায়ক, অযাচিত রিভিউ নেওয়ার কুখ্যাতি থাকলেও এইবেলায় মিরাজ ঠিকই সফল। একই ওভারে শাহিন শাহ আফ্রিদিও খানিকটা একই রকম ভাবে আউট, পাকিস্তান অধিনায়কও বাঁচেননি রিভিউ নিয়ে। ১৮-২২ ম্যাচের এই ৫ ওভারে ৩ উইকেট নিয়ে মিরাজ শেষ করে দেন পাকিস্তানের বাকি সম্ভাবনাটুকুও, শেষবেলায় তাসকিন আর মোস্তাফিজ একটি করে উইকেট নিয়ে খাতায় নাম লেখালেও ততক্ষণে পাকিস্তানের ব্যাটিং ভেঙে পড়েছে হুড়মুড় করে। ৩০.৪ ওভারে ১১৪ রানেই অলআউট পাকিস্তান, নাহিদ রানার ক্যারিয়ারের প্রথমবারের মতো ওয়ানডে ম্যাচে ৫ উইকেট। ৩ উইকেট মিরাজের। সর্বোচ্চ ৩৭ রান ফাহিম আশরাফের।
১১৫ রান তাড়া করতে নেমে শুরুতে সাইফ হাসানকে (১০ বলে ৪) হারালেও অন্যপ্রান্তে থাকা তানজিদ হাসান তামিম দমে যাননি। বরং ওয়ানডাউনে এসে নাজমুল হোসেন শান্তও খেলতে থাকেন মারমুখী ভূমিকায়। দুজনে মিলে ৬৭ বলেই তুলে ফেলেন ৮২ রান। তামিম ৫ ছক্কা আর ৭ বাউন্ডারিতে ৪২ বলে ৬৭* রানের ইনিংস খেলেন, শান্ত দলের জয়ের মাত্র ৫ রান আগে আউট হয়ে যান মোহাম্মদ ওয়াসিমের বলে কট বিহাইন্ড হয়ে। ব্যাটিংয়ে নামা লিটনকে খুব বেশি কিছু করতে হয়নি। বাংলাদেশের জয়সূচক রানটা আসে ওয়াইড থেকে, খেলা শেষ করে দুই দলের ক্রিকেটাররা যখন ড্রেসিং রুমের দিকে যাচ্ছেন তখনই ভেসে আসে মাগরিবের আজান।
ক্যারিয়ারে প্রথমবার ওয়ানডে ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন নাহিদ রানা। ৩ ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে, পরের ম্যাচ শুক্রবার একই ভেন্যুতে।